history-of-Bangladeshi-movies

চলচ্চিত্র শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন

চাষী নজরুল ইসলাম, সিদ্দিক জামান নানটু , আমজাদ হোসেন, জহিরুল হক , আব্দুল্লাহ আল মামুন সেই সময় পুরো পেশাদার মনোভাব নিয়ে চলচ্চিত্রে আসলে শুরু হয় এক নতুন বিপ্লব। যে বিপ্লবের সাক্ষী আবার তোরা মানুষ হো (খান আতাউর রহমান), ওরা ১১ জন (চাষী নজরুল ইসলাম), আলোর মিছিল (নারায়ণ ঘোষ মিতা), কলমীলতা (শহিদুল হক খান) , সীমানা পেরিয়ে (আলমগীর কবির) , সূর্য দিঘল বাড়ী (শেখ নিয়ামত আলী), সারেং বউ (আব্দুল্লাহ আল মামুন) নয়নমণি (আমজাদ হোসেন) এর মত কালজয়ী সব ছবি। এসব সামাজিক ছবির মাঝে তখন পুরো শিল্পের জয়গান চলছিল ঠিক তখনই জহিরুল হক ‘রংবাজ’ ছবির মাধ্যমে প্রথম অ্যাকশন দৃশ্য নিয়ে আসেন। বাংলা চলচ্চিত্র পরিচিত হয় নতুন এক ধারার সাথে। শুরু হয় সামাজিক গল্পের সাথে অ্যাকশন দিয়ে ‘সামাজিক অ্যাকশন” ছবির যুগ শুরু সেখান থেকে।

এরপর আজমল হুদা মিঠুর ‘দোস্তি’, দেওয়ান নজরুল এর ‘দোস্ত দুশমন’ সেই ধারাকেই এগিয়ে নিয়ে গেছে। তখন সারা দেশে বাংলা ছায়াছবির ব্যবসা মানেই নিশ্চিত মুনাফা। তাই তো ধীরে ধীরে গ্রামে, শহরে, গঞ্জে সব জায়গায় সিনেমা হল তৈরির হিড়িক পড়ে যায়।

ঢাকার উচ্চবিত্ত শ্রেণি জড়িত হয় সিনেমা বানানো ও প্রদর্শন এর ব্যবসায়। এদের মধ্য যে নামটি প্রথম উচ্চারিত হবে তিনি ‘আলগীর পিকচারস’ এর কর্ণধার এ কে এম জাহাঙ্গীর খান (কণ্ঠশিল্পী ও চিকিৎসক ঝুমু খান এর বাবা)। তাঁকে আজও বাংলা চলচিত্রের ‘মোঘল’ নামে ডাকা হয়। এতে আরও যে কয়টি প্রযোজনা সংস্থার নাম উল্লেখ যোগ্য সেগুলো হলো ‘সোনামণি ফিল্মস’, ‘মেট্রো ফিল্মস’, ‘আনন্দমেলা চলচ্চিত্র’, ‘আশীর্বাদ কথাচিত্র’ ছিল অন্যতম।

৭০ দশকের শেষ দিকে এ জে মিন্টু, কাজী হায়াত, আজিজুল রহমান বুলি, ইবনে মিজান, সাইফুল আজম কাশেম, হাস্মত, আজিজুর রহমান, বেলাল আহমেদ এর মত মেধাবী ছবি পরিচালনায় আসতে থাকে। যুবকরা শুরু হয় সারাদেশে ছবি দেখার হিড়িক। নিম্নবিত্ত-উচ্চবিত্ত সবার বিনোদনের একটি বড় ও প্রিয় মাধ্যম হয় হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। এমনকি যেসব পরিবারে বিধিনিষেধ কঠোর ছিল সেসব পরিবারের ছেলে মেয়েরাও লুকিয়ে অভিভাবকের চোখ ফাকি দিয়ে দিনের পর দিন সিনেমা হলে যেতো। মেয়েরা বোরকা পড়ে সিনেমা হলে ঢুকত যাতে রাস্তায় পরিচিত কেউ না চিনতে পারে। তখন এমন কোন পরিবার নেই যারা সিনেমা হলে ছবি দেখতো না।

আমার নিজের পরিবার থেকেই আমি বাংলা ছায়াছবির প্রেমে পড়েছিলাম। আমার আব্বু, আম্ম, মামা, খালা ,চাচা , চাচী খালু এমনকি পাড়া প্রতিবেশীরা মিলে বিশাল সদলবলে হলে যাওয়ার কথা আমার এখনও মনে আছে। আমি সিনেমা হলে ছবি দেখতে যাওয়া ব্যাপারটা বুঝতে শিখেছিলাম আমার ৫/৬ বছর বয়সে। আমার অভিভাবকদের মুখে অনেকবার শুনেছি আমাকে খুব ছোট (১/৪ বছর)বেলায় দুপুরে ঘুম পাড়িয়ে দাদী ও বাসার বুয়ার কাছে রেখে সবাই ছবি দেখতে যেতো। আমি নাকি সেসময় হলে গেলে ভয়ে শুধু কান্না করতাম । এজন্য আমাকে নেয়া হতো। আমি যখন সিনেমা দেখা বুঝতে ও আন্দদ পেতে শুরু করি তখন আর আমাকে রেখে যাওয়া হয়নি। আমি হলে যাওয়ার নাম শুনলেই সবার আগে কাপড় চোপর পড়ে রেডি হওয়ার জন্য চিৎকার করতাম।

সেই খুব ছোট বেলায় হলে আমার দেখা ছবিগুলোর নাম এখনও মনে আছে- অবুঝ মন (রাজ্জাক শাবানা), নুরী (ওয়াসিম), পুরস্কার, দায়ী কে, বাঁধনহারা, এই ছবিগুলো ছিল সম্পূর্ণ সাদাকালো। শৈশবে ৮০র দশকে আমার পরিবারের সাথে রঙ্গিন যুগের ছবির মাঝে ছিল- কুসুমকলি, স্বর্গ নরক (রহমান ,শবনম), ভাত দে, অপেক্ষা, চ্যালেঞ্জ, দেশ বিদেশ, নীতিবান, ধনী গরীব, ফুলশয্যা, হুশিয়ার, বাঞ্জারান, জারকা, লড়াকু, ওস্তাদ সাগরেদ, সারেন্ডার, সবুজ সাথী, আগমন, ঝিনুক মালা, দুই জীবন, বৌমা, সন্ধান, যোগাযোগ, তিন কন্যা, লটারি, বিজয়, অপরাধী, বলবান, নিষ্পাপ, চেতনা, বারুদ, উসিলা, দূরদেশ, স্বাক্ষর, অশান্তি, চাঁপা ডাঙ্গার বউ, জিনের বাদশা, পালকী, ক্ষতিপূরণ, ভাইজান, বিশ্বাসঘাতক, ব্যবধান, দুনিয়া, চেতনা, সত্য মিথ্যা, অন্ধ বিশ্বাস, বীরপুরুষ, বজ্রমুসঠি, শিশমহল, ভেজা চোখ ছবিগুলো অন্যতম। সপ্তাহে একদিন হলে ছবি না দেখলে শান্তি পেতাম না।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার , এ জে মিন্টু , শিবলি সাদিক, দেওয়ান নজরুল, সাইফুল আজম কাসেম, কবির আনোয়ার, মতিন রহমান, আওকাত হোসেন, দেলোয়ার জাহান ঝনটু, ফজল আহমেদ বেনজির, সুভাষ দত্ত, চাষি নজরুল, ইবনে মিজান, আমজাদ হোসেন, হাসমত, সিদ্দিক জামান নানটু, মতালেব হোসেন , আজিজুর রহমান ও জহিরুল হক প্রমুখ ছিলেন সামাজিক অ্যাকশন ও প্রেমের ২ ধরনের ছবির কিং পরিচালক ছিলেন। যাদের নাম পোষ্টারে থাকলেই হতো, ছবিতে কে আছে সেটা কোন বিষয় ছিল না। এদের ছবি মানেই হলে ‘হাউসফুল’ লিখা থাকতো। আর ফোক ফ্যান্টাসির জন্য তোজাম্মেল হক বকুল একাই একশো। পুরো অ্যাকশন ছবির জন্য শহিদুল ইসলাম খোকন, আবুল খায়ের বুলবুল, দেওয়ান নজরুল, আজমল হুদা মিঠু ছিল চরম, আর রাজনৈতিক ছবির জন্য কাজী হায়াত একাই একশো। যাদের বিকল্প আজ আর বাংলা চলচ্চিত্রে নেই। তারা যেভাবে যত্ন নিয়ে একটা গল্পকে সিনেমায় রূপ দিতেন তা আজ দেখা যায় না বললেই চলে। যখন প্রযুক্তির উন্নয়ন এর ছোঁয়া লাগেনি তখন আমাদের দর্শকরা অনেক অনেক ভালো গল্পের ছবি পেয়েছিলেন। যার শুধু গল্প নয় গান, শিল্পীদের অভিনয় সব কিছু দর্শকের মনে গেঁথে যেতো।

৯০ এর দশকে মনোয়ার খোকন, জিল্লুর রহমান, শাহ আলম কিরণ, সোহানুর রহমান সোহান, মোতালেব হোসেন, দেওয়ান নজরুল এর অভাবটা একটু হলেও ঘুচিয়েছে। ৯০ দশক তবু পুরানো অনেক পরিচালককে পেয়েছিল এ জে মিন্টু, সাইফুল আজম কাশেম, বকুল, ঝনটু, কামাল আহমেদ, শিবলি সাদিক, মতিন রহমান, বেনজির সবাইকে পেয়েছিল কিন্তু ২০০০ এসে তাঁদের অনেকেই একেবারেই ছিল না। এদের মধ্য মিন্টু অন্যতম। মিন্টুর অভাব এখনও চলচ্চিত্র কেউ পূরণ করতে পারেনি। কাজী হায়াত এর যন্ত্রণা, দাঙ্গা,ত্রাস , চাঁদাবাজ, সিপাহি, দেশপ্রেমিক এগুলো অসাধারণ সাহসী ছবি। কাজী না থাকলে একটানা এতো সাহসী ছবি বাংলা চলচিত্রে পাওয়া যেতো না। বকুল ফোক ছবি যেভাবে দর্শককে খাওয়াত তা কেউ পারবেনা। ফোক ছবিকে আলাদা শিল্পে পরিণত করেন বকুল। আর তিনি সেই পরিচালক যিনি নতুন এর মতো জনপ্রিয় ও সিনিয়র নায়িকার সাথে কমেডিয়ান দিলদারকে একক নায়ক করে “আব্দুল্লাহ” বানিয়েছিলেন যা দর্শককে আনন্দ দিয়েছে। তার নাম তোজাম্মেল হক বকুল । সালমান, ওমরসানি, জসীম, রুবেল, মান্নার সেরা সময়ে দিলদারকে নায়ক বানানোর মত সাহস কয়টা পরিচালকের ছিল? একমাত্র বকুল প্রমান করেছে গল্প ও মেকিং সুন্দর হলে দর্শক সিনেমা দেখতে আসবেই। চিন্তা করতে পারেন যে একজন সিনিয়র নায়িকার সাথে পুরো কমেডিয়ান একজন কে নায়ক বানানোর মত রিস্ক কেমন কলিজা থাকলে একজন পরিচালক করতে পারে? ভারতের পরিচালক রাও তো এই রিস্কে যাবেনা ও যায়নি আজ পর্যন্ত। বলেন তো কোন ছবিতে জনি লিভার নায়ক এর সাথে শ্রীদেবী কে নায়িকা চরিত্রে দেখেছেন?

আজ এই শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে! যা মনের ভেতর প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ করে যাচ্ছে! আমাদের দর্শকরা আজ হিন্দি ছবির জোয়ারে ভাসছে। তারা বাংলার চেয়েও বেশী হলো ভারতপ্রেমি যা অনেক ভারতীয়কেও হার মানাবে। আমার শৈশব- কৈশোর বেলায় তো হিন্দি সিনেমা আমরা প্রতিনিয়ত দেখতাম কিন্তু তাই বলে কোনদিন আমার বাংলা সিনেমা কে আমি ভুলে যাইনি। আমার হলে যাওয়া আমি ছেড়ে দেইনি সেই গত শতাব্দীর শেষ দশকের পুরোটা সময় কেটেছিল ছবি বাংলা ও হিন্দি সিনেমা দেখে। কই আমিতো আমার মনের মাঝে আজ যে হিন্দি সিনেমা দেখিনা তার জন্য একবারও দুঃখ লাগেনা। বরং গত ১০টি বছর হলে গিয়ে দলবেঁধে বাংলা ছবি না দেখার কষ্ট খুব পোড়ায়। আসুন না একবার আমরা সবাই আমাদের দেশের এই শিল্পকে রক্ষার জন্য কাজ করি। এই শিল্পের মাঝেও যে আমার বাংলাদেশের সংস্কৃতি মিশে আছে। এই সংস্কৃতিকে আমরা কি বিলীন হতে দিতে পারি? একবার নিজের মন কে প্রশ্ন করেন যারা বলেন ‘আমাদের ছবির মান ভালো না, রুচিহীন তারা কি এই শিল্পকে উন্নত করার জন্য কোন পদক্ষেপ নিয়েছেন? নেননি? তাহলে আপনার বাংলা সিনেমাকে খারাপ, মানহীন বলে চিৎকার করার কোন অধিকার আপনার নেই। আমি মনে করি ঐসব শিক্ষিত আধুনিক সমাজ এক দেশের শিল্পের পক্ষে দালালি করছে আর আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংস হওয়ার পেছনে ঐসব দর্শকদের অনেক অবদান আছে যারা আমাদের শিল্পকে ধ্বংস করে বিদেশী সংস্কৃতিকে এদেশে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আজ সময় হয়েছে চলচ্চিত্র শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার এবং এই শিল্পের ধ্বংসের পেছনে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করার।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *