নায়ক নায়িকার প্রেম, রোমান্টিক গান,অ্যাকশন এমন সস্তা ফর্মুলা ছাড়াও যে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ছবি ভুরিভুরি আছে সেটা আজকের অন্ধ পণ্ডিতরা জানে না।
বিনোদন

নির্মম ও করুণ গল্পের নান্দনিক চলচ্চিত্র ‘ভাত দে’

ফজলে এলাহী পাপ্পু
আমাদের ফেলে আসা সোনালি দিনের মূলধারার চলচ্চিত্রের ভাণ্ডারে কত যে হীরা-মনি-মুক্তা লুকিয়ে আছে তা যে দেখেনি সে কোনদিন জানবে না।

বাংলাদেশের মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র যে নায়ক নায়িকার প্রেম, রোমান্টিক গান,অ্যাকশন এমন সস্তা ফর্মুলা ছাড়াও যে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ছবি ভুরিভুরি আছে সেটা আজকের অন্ধ পণ্ডিতরা জানে না ।

ছবিতে তেমনই একটি অসাধারন কালজয়ী বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের পোস্টার দেখতে পাচ্ছেন যে ছবিটা দেখে সিনেমা হলের সব শ্রেণীর দর্শকদের ভালো লেগেছিল এবং যে ছবিটার কথা মনে হলেই শাবানা নামের কিংবদন্তী অভিনেত্রীর কথা মনে পড়ে যায় ।

আমজাদ হোসেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক কীর্তিমান পুরুষ যার একাধিক চলচ্চিত্র আছে যা দর্শক সমালোচক সব শ্রেণীর মন জয় করে নিয়েছিল । ১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভাত দে‘ ছবিটি ছিল সে বছরের সেরা ছবিগুলোর শীর্ষে থাকা একটি ছবি ।

তৎকালীন সমাজের শ্রেণী বৈষম্য আর সমাজের অসহায় হতদরিদ্র মানুষগুলোর উপর ক্ষমতাবান মানুষগুলোর অমানবিক আচরণ ,শোষণ, নির্যাতন এই ছবির মাধ্যমে অসাধারন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন আমজাদ হোসেন। অন্ন,বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত সমাজের যে মানুষগুলো তাঁদের কথা আমাদের এই বিবেক,সমাজ তথা রাষ্ট্র কোনদিন শুনতে চায় না।

হলে দেখার সৌভাগ্য
ভাত দে ছবিটি সিলেটের মনিকা সিনেমা হলে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার; যার কথা মনে পড়লে আজো বিস্মিত হই। সিনেমা হলে আসা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের নিম্ন -উচ্চ সব শ্রেণীর দর্শকরা সেদিন এই ছবিটি দেখে কেঁদেছিল। দর্শকের কাছে মনে হয়েছিল তারা যেন পর্দায় কোন কাল্পনিক গল্প নয় এতক্ষন এই দেশের কোন দরিদ্র কোন নারীর জীবন কাহিনী স্বচক্ষে দেখলো যা দেখে দর্শক আবেগ ধরে রাখতে পারেনি । আজও চোখে ঝাপসা ঝাপসা ভাসে সিনেমা হলের বড় পর্দায় দেখা ছবির নানা দৃশ্যগুলো।

ভাত দে চলচ্চিত্রের গল্প সংক্ষেপ
বাংলাদেশের কোন এক গ্রামের দরিদ্র এক বাউল শিল্পীর মেয়ে জরির জীবনের গল্প । যে জরির মা (আনোয়ারা ) অভাবের তাড়নায় জর্জরিত হয়ে একটু সুখের আশায় পরপুরুষের হাত ধরে জরিকে একা ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল। আনোয়ারাকে একা ঘরে রেখে মেয়ে জরিকে নিয়ে গান গেয়ে পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে গিয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন। এক বালু ঝড়ে চোখের ভেতর বালু ঢুকে আনোয়ার হোসেন অন্ধ হয়ে যায় । জরি (শিশুশিল্পী আঁখি) অন্ধ বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এসে দেখে ঘর শূন্য । মা নেই । সেই থেকে অন্ধ বাবাকে নিয়ে জীবন সংগ্রাম শুরু । জরি বড় হওয়ার পর একদিন বা আড়তদাড় রাজীবের নির্যাতনে অন্ধ বাবাও মারা যায় । আনোয়ার হোসেনের সাগরেদ আলমগীর একদিন আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে এসে কবরে সামনে বসে কাঁদছিল। সেই থেকে আলমগীর জড়িয়ে যায় তাঁর ওস্তাদের মেয়ে শাবানার জীবনে । একাকী অসহায় শাবানার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় আলমগীর। আলমগীর-শাবানা দুজনে ভালোবেসে ঘর বাঁধে । শাবানাকে বাড়িতে রেখে কাজের সন্ধানে শহরে যায় আলমগীর । শাবানার উপর কু-দৃষ্টি পড়ে আড়তদাড় রাজীবের । রাজীবের কুট কৌশলে মিথ্যা মামলায় জেলে যায় আলমগীর। মিথ্যা মামলায় জেল হয় কয়েক বছরের। আলমগীরের শোকে ও জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতে জর্জরিত হয়ে পাগল হয়ে যায় শাবানা। রাস্তায় রাস্তায় পাগলীর মতো ঘুরে বেড়ায় আর ক্ষুধায় জ্বালা সইতে না পেরে খাবার চুরি করে ।

তৎকালীন আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের করুন গল্প
আমজাদ হোসেন ভাত দে ছবিটির মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন গ্রাম বাংলার তৎকালীন আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের এক নির্মম করুন গল্প যা দর্শকদের মনে দাগ কাটে ভীষণভাবে । তৎকালীন সমাজের শ্রেণী বৈষম্য আর সমাজের অসহায় হতদরিদ্র মানুষগুলোর উপর ক্ষমতাবান মানুষগুলোর অমানবিক আচরণ , শোষণ, নির্যাতন এই ছবির মাধ্যমে অসাধারন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন আমজাদ হোসেন। অন্ন , বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত সমাজের যে মানুষগুলো তাঁদের কথা আমাদের এই বিবেক , সমাজ তথা রাষ্ট্র কোনদিন শুনতে চায় না । স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও যারা মৌলিক অধিকারগুলোর প্রধান দুটি অন্ন ও বস্ত্রের চাহিদা পূরণ করবার জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করে যাচ্ছে তাঁদের করুন কাহিনী এই ছবির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় । এই সমাজ, রাষ্ট্র আজো পারেনি রাষ্ট্রের বড় একটি অংশের ন্যূনতম চাহিদাগুলো পূরণ করতে বরং এই সমাজের মানুষগুলো তাঁদের সাথে চিরকাল নিষ্ঠুর নির্মম আচরণ করে যাচ্ছে ।

শিল্পগুণে অতুলনীয় বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র
ভাত দে ছবিটি আমজাদ হোসেন এর শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম একটি মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র যা শিল্পগুনেও অতুলনীয়। ছবির কাহিনী, সংলাপ , চিত্রনাট্য ও সঙ্গীত এতো শক্তিশালি ছিল যে যার সাথে অভিনেতা অভিনেত্রীদের অসাধারন অভিনয় মিলেমিশে একটি কালজয়ী দর্শকনন্দিত চলচ্চিত্রে স্থান করে নিয়েছে । ছবির লোকেশন, চিত্রায়নও ছিল দারুন । এই ছবির প্রথম শুটিং শুরু হয় ,মানিকগঞ্জের একটি গ্রামে । সেদিন শুটিং চলাকালীন শাবানার পরিহিত শাড়িটি ছিল এতো পরিপাটি যা পরিচালকের ভীষণ অপছন্দ হয়, পরবর্তীতে শুটিং দেখতে আসা ভিড়ের মাঝখান থেকে গ্রামের এক মহিলার ছেঁড়া শাড়ি যোগাড় করে শাবানাকে দিলে পরিচালক নতুন করে দৃশ্য ধারন করেন । আমজাদ হোসেনের লিখা ও আলাউদ্দিন আলীর সুরে ছবিটির সবগুলো গান ছিল নান্দনিক, শৈল্পিক ও মন ছুঁয়ে যাওয়া।

আমজাদ হোসেনের দক্ষ-সুনিপুণ পরিচালনা
ছবির শুরুটা হয়েছিল ‘কত কান্দলাম কত গো সাধলাম ‘ দিয়ে আর শেষ ‘তিলে তিলে মইরা যামু/ তবু তোকে ডাকবো না’’ এর মতো হৃদয়বিদারক এক গান দিয়ে। এতো করুন একটি গল্পের ভেতরেও ‘গাছের একটা পাতা পড়লে / কাছের একটা মানুষ মরলে ‘ এর মতো জীবনঘনিষ্ঠ কথার গান আবার ‘ চিনেছি তোমারে/ আকারে প্রকারে/ দিনের আলো রাতের আঁধারে’ এর মতো দারুন মিষ্টি একটি রোমান্টিক গান । প্রতিটি গানের কথা যেমন অসাধারন তেমনি সুর ও কণ্ঠশিল্পীর গায়কি ছিলও অসাধারন । প্রতিটি গান প্রথমবার শুনলেই মনে চিরদিনের মতো গেঁথে যাবে। ছবিটির গল্প শিক্ষিত অশিক্ষিত সব শ্রেণীর দর্শকদের কাছে ছিল সহজবোধ্য । এতো করুন একটি গল্প অথচ দর্শকের কাছে ছবিটি একটি মুহূর্তের জন্যও বিরক্তিকর বা একঘেয়ে লাগেনি তাঁর কারন একটি ভালো চলচ্চিত্রের সবগুলো গুণাবলি ছবিটিতে ছিল যার সাথে যুক্ত হয়েছিল আমজাদ হোসেনের দক্ষ ও সুনিপুণ পরিচালনা।

‘ভাত দে’ ছবিটি সেই বছর দর্শক ও সমালোচকদের মন জয় করে ‘শ্রেষ্ঠ ছবি’ হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছিল । এছাড়াও ‘ভাত দে’ ছবিটির জন্য আমজাদ হোসেন ( শ্রেষ্ঠ পরিচালক , চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা) ,শাবানা (শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী) , আঁখি (শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী), এমএ বাসেত (সেরা শব্দগ্রাহক ), মুজিবুর রহমান দুলু (সেরা সম্পাদক) , অঞ্জন ভৌমিক ( সেরা শিল্প নির্দেশক) সহ সেইবছর জাতীয় চলচ্চিত্রের ৯ টি শাখায় পুরস্কার অর্জন করেছিল । এক কথায় বলতে গেলে ‘ভাত দে’ ছবিটি হলো স্বাধীন বাংলাদেশের মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি ছবি এবং কিংবদন্তী পরিচালক আমজাদ হোসেনের রচিত ও নির্মিত খুব করুন একটি গল্পের শৈল্পিক ও নান্দনিক ছবি যা দর্শকদের মনে দাগ কেটে যায় বারবার।

লেখকের মন্তব্য
আজকের মিডিয়ায় কাজ করা যে সকল অন্ধ তরুণরা বলে থাকে যে ‘আমাদের মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে কোন মেধাবী ছিল না’ সেই সমস্ত জ্ঞানপাপীদের জন্য আমজাদ হোসেনের ‘ভাত দে’ ছবিটি হলো অনেক শক্তিশালি একটি ‘চপটাঘাত’ । যে সমস্ত জ্ঞানপাপীরা বলে আমাদের চলচ্চিত্রের সোনালি যুগ ছিল নাকি নেই বনে শিয়াল রাজা’র মতো অর্থাৎ সেদিন যারা ছিলেন তাঁদেরকে ঐ অন্ধ তরুনরা গোনাতেও ধরে না যা আমাদের দৈনতা’র নির্লজ্জ উদাহরন। আগেও বলেছি, বারবার বলছি যে বাংলাদেশের মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র সম্পর্কে না জেনে না বুঝে কোন বাজে নেতিবাচক ধারনা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিবেন না। অন্ধের মতো কথা না বলে ‘ভাত দে’ ছবির মতো একটি করুন গল্পের নান্দনিক ছবি সব শ্রেণীর দর্শকদের জন্য আজ একটা বানিয়ে দেখান তো।

কৃতজ্ঞতা
অনেক প্রিয় ‘ভাত দে’ ছবিটির পোস্টারটি সংগ্রহ করে দিয়েছেন শানু ভাই যার কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *