চলচ্চিত্রের পুরস্কারগুলো কী ফেরত দেবেন মুক্তিযোদ্ধারা?

চলচ্চিত্রের পুরস্কারগুলো কী ফেরত দেবেন মুক্তিযোদ্ধারা?

চলচ্চিত্রের পুরস্কারগুলো কী ফেরত দেবেন মুক্তিযোদ্ধারা?ফজলে এলাহী
বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় সবসময় বোকাসোকা, সহজ সরল, হাসিখুশি মানুষ ছিলেন দিলদার ভাই যার কাজ ছিল শত কষ্ট ভরা গল্পেও দর্শকদের একটু আনন্দ দেয়া। পর্দার হাসিখুশি ভালো মানুষটি যখন ব্যক্তি জীবনে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী’ আদর্শের সৈনিক হোন তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে বাংলাদেশের সাধারন মানুষের হাসি কান্না, সুখ দুঃখের সাথী হলো ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ বা বিএনপি যে দলের প্রতি বাংলার সাধারন মানুষের আস্থা সীমাহীন ।

এবার মূল কথায় আসি। গত কয়েক বছর ধরে ‘বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী’ বলে একটি গোষ্ঠী লাগাতার মিথ্যা অপপ্রচার করে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করেই যাচ্ছে । আমি রাজনীতি দিয়ে নয় শিল্প সংস্কৃতিতে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার ব্যাপারে বিএনপির কিছু কর্মকাণ্ড তুলে ধরছি ।

১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ প্রবর্তন করেন যে পুরস্কারটি আজো প্রদান করা হচ্ছে ও যা অনেক তথাকথিত চেতনাধারী শিল্পী বগলদাবাও করেছেন ।

১৯৭৬ সালে হারুনুর রশিদের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘মেঘের অনেক রঙ’ ছবিকে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ পরিচালক শাখায় জাতীয় পুরস্কার দেয়াসহ ছবিটিকে সর্বমোট ৫ টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার দেয়া হয়েছিল । শুধু তাই নয়, ৭৬-৮০ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র শহিদুল হক খানের ‘কলমিলতা’, মতিন রহমানের ‘চিৎকার’ ও এ জে মিন্টুর ‘বাঁধনহারা’ ছবিগুলো নির্মিত হয়েছিল ।

বিএনপি যদি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতাকারী হতো তাহলে কোনভাবেই নিজেদের বিপক্ষে যায় বা নিজেদের আদর্শের বিপক্ষে নির্মিত চলচ্চিত্রকে মুক্তি দিতো না ও এতোগুলো জাতীয় পুরস্কারও দিতো না ।

একটি কথা না বললেই নয় তা হলো ১৯৭২ সালে নির্মিত মমতাজ আলির ‘রক্তাক্ত বাংলা’ ছবির টাইটেলে বীরমুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান ও তাঁর অধীনস্থ ইউনিটকে চলচ্চিত্রটি নির্মাণে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জানান।

ফিরে যাই ৯১ -৯৬ সালের বিএনপি সরকারের আমলে । সেই সময়ে নির্মিত মূলধারা ও বিকল্পধারা অনেক চলচ্চিত্রে বারবার মুক্তিযুদ্ধ উঠে এসেছে যা এখন পর্যন্ত এতবার আমরা দেখিনি ।

বিশেষ করে সেইসময়ের মূলধারার চলচ্চিত্র গুলোর মাঝে কোন না কোন ভাবে সবচেয়ে বেশি মুক্তিযুদ্ধ এসেছিল । সেই সময়ের জাতীয় পুরস্কারে তালিকাটা বের করে দেখেন যে একাত্তরের যীশু, আগুনের পরশমণি , মুক্তির গান চলচ্চিত্রগুলো যেমন কোন না কোন শাখায় পুরস্কার পেয়েছিল ঠিক তেমনি দাঙ্গা, ত্রাস, চাঁদাবাজ, ঘাতক, কমান্ডার, দেশপ্রেমিকের মতো মুক্তিযুদ্ধ ও সমসাময়িক বিষয়ের উপর নির্মিত আগুনঝরা চলচ্চিত্রগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়েছে ।

১৯৯৪ সালে হুমায়ুন আহমেদের ‘আগুনের পরশমনি’ ও ‘দেশপ্রেমিক’ ছবি দুটো যৌথ ভাবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করে। শুধু তাই নয় হুমায়ুন আহমেদের ‘আগুনের পরশমনি’ ছবিটি শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার [ হুমায়ুন আহমেদ] , শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা [ হুমায়ুন আহমেদ] , শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী [ বিপাশা হায়াত ], শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী [ শিলা আহমেদ] , শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক [ সত্য সাহা] , শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক [ মফিজুল হক] সহ সর্বমোট ৮ টি শাখায় পুরস্কার লাভ করে এবং দেশপ্রেমিক ছবিটি ৪টি শাখায় পুরস্কার লাভ করে।

বিএনপি যদি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতাকারী হতো তাহলে কোনভাবেই নিজেদের বিপক্ষে যায় বা নিজেদের আদর্শের বিপক্ষে নির্মিত চলচ্চিত্রকে মুক্তি দিতো না ও এতোগুলো জাতীয় পুরস্কারও দিতো না ।

১৯৯৪ সালেই নির্মিত ‘ঘাতক’ ও ‘কমান্ডার’ ছবি দুটোকেও জাতীয় পুরস্কার দিয়েছিল তৎকালীন বিএনপি সরকার । ১৯৯৫ সালে একইভাবে তারেক মাসুদের মুক্তির গান ও তানভীর মোকাম্মেলের ‘নদীর নাম মধুমতি’ নামের বিকল্ধারার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র দুটোকে একাধিক শাখায় পুরস্কৃত করতো না ।

এরপর বিএনপি সরকার নেই , এলো আজকের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের একমাত্র দাবীদার গোষ্ঠীটি যারা ১৯৯৭ সালে নির্মিত ও মুক্তিপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘হাঙর নদীর গ্রেনেড’ ও ‘এখনও অনেক রাত’ ছবি দুটোর একটিকেও শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার না দিলেও শ্রেষ্ঠ পরিচালক শাখা চাষী নজরুল ও শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক শাখায় খান আতাউর রহমানকে পুরস্কার দেয় ।

মজার ব্যাপার হলো দু দুটো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রকে মাত্র ৫ টি শাখায় পুরস্কার দেয়া হয় আর মোরশেদুল ইসলামের ‘দুখাই’ চলচ্চিত্রটিকে একাই ৯ টি পুরস্কার দেয়া হয় ।

খুব ভালো করে খেয়াল করে দেখেন যে ৯৪ সালে মুক্তিযুদ্ধের তথাকথিত বিরোধী গোষ্ঠী যেখানে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমনি ‘ ৮ টি পুরস্কার দিয়েছিল ও তার সাথে ঘাতক ও কমান্ডার ছবি দুটো যোগ করলে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র ১০ টি শাখা পুরস্কার দিয়েছিল সেখানে দু দুটো মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অসাধারন চলচ্চিত্রগুলোকে দায়সারা ভাবে ৫ টি পুরস্কার দেয় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একমাত্র দাবীদার গোষ্ঠীটি । ঐ ৯৭ সালেই যে দুটো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র পেয়েছিলাম এরপর আর ২০০১ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উল্লেখযোগ্যক কোন চলচ্চিত্র আমরা পাইনি ।

২০০১ সালের অক্টোবরে নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এরপর আবার আমাদের চলচ্চিত্রে আমরা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু অসাধারন চলচ্চিত্র পাই যা হলো তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ [২০০২], হুমায়ুন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া ‘ [২০০৪] , তৌকির আহমেদের ‘জয়যাত্রা’ [২০০৪] , চাষী নজরুল ইসলামের ‘মেঘের পরে মেঘ’ [ ২০০৪], চাষী নজরুল ইসলামের ‘ ধ্রুবতারা'[২০০৬] , মোরশেদুল ইসলামের ‘খেলাঘর ‘ (২০০৬) চলচ্চিত্রগুলো ।

এর মাঝে তৌকির আহমেদের ‘জয়যাত্রা’ ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ মোট ৭ টি শাখায় ২০০৪ সালের জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে যা আবারো প্রমান করে দেয় যে বাংলাদেশ জাতিয়তবাদী দল মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ না বিপক্ষ গোষ্ঠী তা।

মজার ব্যাপার হচ্ছে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় আছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দাবীদার গোষ্ঠীটি যাদের এই ৬ বছরে এখন পর্যন্ত ৭ টি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে যার মধ্যে একমাত্র ২০১১ সালে নাসির উদ্দিন ইউসুফের ‘গেরিলা’ ছাড়া আর কোন চলচ্চিত্র উল্লেখ করার মতো একাধিক শাখায় পুরস্কার পায়নি ।

এবার আপনারা তথ্যগুলো যাচাই করে নিজেরাই ভেবে দেখুন তো বিএনপি কি আসলেই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি কিনা ?

সবশেষে এইটুকু বলবো যে, বিএনপি বা ‘বাংলাদেশ জাতিয়তবাদী দল ‘ কলকাতায় বা পাকিস্থানে বসে মুক্তিযুদ্ধ করা তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে গড়া দল নয় ।মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্থানের ভাতায় এইদেশে সুখে থাকা তথাকথিত কোন মুক্তিযোদ্ধার হাতে গড়া দল নয়।

বিএনপি হলো যুদ্ধের ময়দানে থাকা জীবন বাজি রাখা বীরমুক্তিযোদ্ধাদের গড়া দল যে দলের মতো এতো মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলের মাঝে নেই । এতোজন সেক্টর কমান্ডার ও এতো খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা থাকাতেই প্রতিপক্ষ আজ হিংসায় জ্বলে পুরে বারবার বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে যা কোনদিন সফল হবে না।

আমাদের দেশের চেতনার চাটুকার বুদ্ধিজীবীদের মতো যদি বুদ্ধিজীবীর দল যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, রাশিয়া, চীনে থাকতো তাহলে এতদিনে আমরা ৩য় , ৪র্থ বিশ্বযুদ্ধ দেখে ফেলতাম ।

আফসোস! গাধা জল খায় তবে ঘোলা করে খায় । যদি বিএনপিকে সত্যিই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি মনে করেন তাহলে সেই গোষ্ঠীর দেয়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারগুলো ফেরত দেয়া বা প্রত্যাখ্যান করার সাহস দেখান দেখি । কারণ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী গোষ্ঠীর কাছ থেকে তো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ গোষ্ঠীর কোন পুরস্কার নেয়া মানায় না, এতে মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করা হয় । পারবেন কি পুরস্কারগুলো ফেরত দিতে ? যদি না পারেন তাহলে মিথ্যা অপ্রচার করে সাধারন মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন না।আপনাদের ভণ্ডামি আমরা অনেক দেখেছি ,আর না ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *