প্রতিবাদী কবি রফিক আজাদ আর নেই

প্রতিবাদী কবি রফিক আজাদ আর নেই

537
0
SHARE

প্রতিবাদী কবি রফিক আজাদ আর নেইবাংলা ভাষার অন্যতম প্রতিবাদী কবি রফিক আজাদ আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারজয়ী রফিক আজাদ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবি।

আজ শনিবার দুপুর ২টা ১০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। মৃত্যুকাল তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তিনি স্ত্রী অধ্যাপক দিলারা হাফিজ, ছেলে অব্যয় আজাদ ও অভিন্ন আজাদকে রেখে গেছেন। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন চিকিৎসার পর ১৩ ফেব্রুয়ারি কবির অবস্থার আরো অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতে লাইফসাপোর্টে রাখা হয়।

রফিক আজাদের স্ত্রী অধ্যাপক দিলারা হাফিজ, ছেলে অব্যয় আজাদকে সান্ত্বনা দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ছুটে এসেছেন কবি সৈয়দ শামসুল হক, তার স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক, কবি আসাদ চৌধুরী, সাংস্কৃতিকব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, সম্মিলিত জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কবি তারিক সুজাত, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কবি নাসির আহমেদ, কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, মুজিব ইরম, ওবায়েদ আকাশসহ আরও অনেকে। এসেছিলেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।

১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কবি রফিক আজাদ। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাবা-মার কঠিন শাসন উপেক্ষা করে ভাষা শহীদদের স্মরণে খালি পায়ে মিছিল করেন তিনি।

চিরদিনই প্রতিবাদী এই কবি তার দ্রোহকে শুধু কবিতার লেখনীতে আবদ্ধ না রেখে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন জাতির চরম ক্রান্তিকালে, ১৯৭১ এ হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনের সৈনিক হিসেবে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নেন তিনি। কর্মজীবনে রফিক আজাদ বাংলা একাডেমির মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’র সম্পাদক ছিলেন। ‘রোববার’ পত্রিকাতেও রফিক আজাদ নিজের নাম উহ্য রেখে সম্পাদনার কাজ করেছেন। এছাড়া টাঙ্গাইলের মওলানা মুহম্মদ আলী কলেজের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনাও করেন তিনি।

রফিক আজাদের প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে, ‘অসম্ভবের পায়ে’, ‘সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে’, ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ২০১৩ সালে একুশে পদক পান তিনি। সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন হুমায়ুন কবির স্মৃতি (লেখক শিবির) পুরস্কারসহ আরও বেশ কয়েকটি পুরস্কার।

কবি রফিক আজাদের দাফন সোমবার তার ছেলে অভিন্ন আজাদ দেশে ফিরলে সম্পন্ন করা হবে।

কবির ভাতিজি ড. নীরু শামসুন্নাহার শনিবার বিকেলে বিষয়টি জানান।

তিনি আরো জানান, কবির মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। সোমবার সকাল ১০টায় প্রথমে মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেওয়া হবে।

সেখান থেকে বাংলা একাডেমিতে নেওয়ার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানান ড. নীরু শামসুন্নাহার।

সদ্য প্রয়াত কবি রফিক আজাদের ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে লেখা ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতাটি পাঠকদের জন্য দেয়া হলঃ

ভাত দে হারামজাদা

রফিক আজাদ

ভীষণ ক্ষুধার্ত আছিঃ উদরে, শরীরবৃত্ত ব্যেপে
অনুভূত হতে থাকে- প্রতিপলে- সর্বগ্রাসী ক্ষুধা
অনাবৃষ্টি- যেমন চৈত্রের শষ্যক্ষেত্রে- জ্বেলে দ্যায়
প্রভুত দাহন- তেমনি ক্ষুধার জ্বালা, জ্বলে দেহ
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোন দাবী
অনেকে অনেক কিছু চেয়ে নিচ্ছে, সকলেই চায়ঃ
বাড়ি, গাড়ি, টাকা কড়ি- কারো বা খ্যাতির লোভ আছে
আমার সামান্য দাবী পুড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর-
ভাত চাই- এই চাওয়া সরাসরি- ঠান্ডা বা গরম
সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চাল হ’লে
কোনো ক্ষতি নেই- মাটির শানকি ভর্তি ভাত চাইঃ
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে ছেড়ে দেবো অন্য-সব দাবী;
অযৌক্তিক লোভ নেই, এমনকি নেই যৌন ক্ষুধা
চাইনিতোঃ নাভি নিম্নে পরা শাড়ি, শাড়ির মালিক;
যে চায় সে নিয়ে যাক- যাকে ইচ্ছা তাকে দিয়ে দাও
জেনে রাখোঃ আমার ওসবের কোনো প্রয়োজন নেই।

যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবী
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘ’টে যাবে
ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন কানুন-
সম্মুখে যা কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমেঃ
থাকবে না কিছু বাকি- চলে যাবে হা ভাতের গ্রাসে।
যদি বা দৈবাৎ সম্মুখে তোমাকে ধরো পেয়ে যাই-
রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপাচার হবে।
সর্বপরিবেশগ্রাসী হ’লে সামান্য ভাতের ক্ষুধা
ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ করে।

দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে
অবশেষে যথাক্রমে খাবো : গাছপালা, নদী-নালা
গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব প্রধান নারী
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ী
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ
ভাত দে হারামজাদা,
তা না হলে মানচিত্র খাবো।

Comments

comments