হাসিনা নন খালেদা। এসব যুক্তি হাসিনার বেলায় প্রযোজ্য হতে পারে। ওয়ান ইলেভেনের পর তিনি দুইবার দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন বিদেশে আমেরিকায় পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে থাকতে।
মতামত

ওয়েলকাম খালেদা জিয়া: ব্যাক টু দি ফিউচার পার্ট ফোর

হাসিনা নন খালেদা। এসব যুক্তি হাসিনার বেলায় প্রযোজ্য হতে পারে। ওয়ান ইলেভেনের পর তিনি দুইবার দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন বিদেশে আমেরিকায় পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে থাকতে। শফিক রেহমান

‘গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে খালেদা জিয়া দেশে আসছেন না।”

সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই ভবিষ্যদ্বাণীটি করেছিলেন (দৈনিক যুগান্তর, ১৭ নভেম্বর ২০১৫)।

জেনারেল এরশাদের এই উক্তি প্রকাশিত হবার মাত্র চার দিন বা ৯৬ ঘণ্টা পরেই ২১ নভেম্বর ২৯১৫-তে বিএনপি চেয়ারপারসন ম্যাডাম খালেদা জিয়া এমিরেটস এয়ারলাইনের ফ্লাইট জিরো জিরো সিক্সে স্বদেশে ফিরে এসেছেন।

এই ভবিষ্যদ্বাণীর দুই দিন আগেও এরশাদ বলেছিলেন, ‘‘এখন সংলাপের প্রস্তাব দেয়ার মতো অবস্থায় নেই বিএনপি। তিনি (খালেদা জিয়া) দেশে ফিরতে পারবেন কি না তারও ঠিক নেই (যুগান্তর ১৫ নভেম্বর ২০১৫)।’’

ইতিমধ্যে বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা এবং পার্টির বাইরে অন্যরা যারা বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একমাত্র নেতা খালেদা জিয়াই তারা সবাই এক বাক্যে বলবেন ‘ওয়েলকাম ব্যাক, লেট আস অল গো ব্যাক টু দি ফিউচার।’

এরশাদের ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রতিপন্ন হওয়ায় তিনি নিজে হয়তো আশ্চর্য হননি। কারণ, এরশাদ ভাগ্যবাদী এবং প্রায় নয় বছর ক্ষমতায় থাকা কালে নিজের ভাগ্য গণনার জন্য বহুবার বঙ্গভবন থেকে ছুটে গিয়েছিলেন আটরশির পীরের কাছে। আটরশির পীর তার জন্য একেছিলেন আরো দীর্ঘকাল ক্ষমতায় বহাল থাকার ছবি। এরশাদ বিনিময়ে তাকে ও তার শিষ্যদের দিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য।

কিন্তু আটরশির পীরের ভবিষ্যদ্বাণীও মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছিল।
হার্ড লাক।

শুধু এরশাদই নন। বস্তুত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫-তে খালেদা জিয়া লন্ডনে যাবার পর থেকেই আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি এবং তাদের সমর্থক মিডিয়া থেকে একটানা প্রচার চলেছিল তিনি আর দেশে ফিরবেন না। এরশাদের তুলনায় আরও নশ্বর পলিটিশিয়ানরা যেমন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সেলিম, আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ প্রমুখ প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করে চলেছিলেন।
আর তাই বাংলাদেশের সর্বত্র পান-চিনি-হলুদ-বিয়ে-বৌভাতের এই সিজনে অভ্যাগতদের মুখ্য প্রশ্নটি ছিল- খালেদা জিয়া আর স্বদেশে ফিরে আসবেন কি না?

তিনি তো অসুস্থ। তার লম্বা চিকিৎসা দরকার।
তার তো বয়স হয়েছে। তার বিশ্রাম দরকার।
তিনি ছেলের পরিবারের সঙ্গে বাদবাকি জীবন লন্ডনেই কাটিয়ে দিতে চান। তার পারিবারিক যত্ন দরকার।
ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

খালেদা জিয়া দেশে ফিরলে তাকে গ্রেফতার করা হবে অথবা সাজানো মামলার রায়ে তাকে নিজ গৃহে অন্তরীণ করা হবে। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে গত দুই মাসে এমন হুমকিও এসেছে। এসব হুমকির প্রেক্ষিতে আহারের সমাপ্তি টানতে টানতে অভ্যাগতরা তাদের সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন, এই মুহূর্তে খালেদার দেশে ফেরা উচিত হবে না। সুতরাং তিনি লন্ডনেই থেকে যাবেন।

এসব পূর্ণ এবং অর্ধ ভবিষ্যদ্বাণী যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন দেশে হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি ব্যাখ্যায় জানানো হয়েছিল, প্রায় ৫,০০০ বছর আগে অ্যাসিরিয়ানদের শাসন আমলেও ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাদের খুব কদর ছিল। তাদের উপদেশ মোতাবেক শাসকরা চলতেন। কিন্তু সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দিতে ‘‘যুক্তির যুগ” (Age of Reasons) শুরু হবার পর ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাদের ওপর শ্রদ্ধা ও ভক্তি মানুষ হারিয়ে ফেলে।

কিন্তু তারপরও বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দিতে ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাদের কদর অনেকের কাছে ছিল এবং আছে। ক্লিভল্যান্ড, ওহাই’র মনস্তাত্ত্বিক উপদেষ্টা মিজ রোজানা রজার্স বলেন, “ভবিষ্যৎ জানতে কতো জাদরেল সব মানুষ যে কতো আগ্রহী সেটা প্রকাশ করলে সাধারণ সব মানুষ তাজ্জব হয়ে যাবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘ফিলাডেলফিয়ার বহু ব্যাংকার, হলিউডের বহু আইনজীবী এবং দেশের শীর্ষ ৫০০টি কম্পানির সিইও’রা গণকদের কাছে নিয়মিত যান। খুব ধনী ও খুব শক্তিশালী ব্যক্তিরা কোনো বড় ডিসিশন নেয়ার আগে গণকদের মতামত নেন। এ রকম প্রায় ৪,০০০ ব্যক্তি আমার ক্লায়েন্ট।’’

রোজানা রজার্স অবশ্য নিজেকে গণক বলেন না। তিনি আপগ্রেডেড করেছেন নিজেকে। তিনি নিজেকে বলেন সাইকিক কাউন্সেলর (Psychic Counsellor)।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান, মোনায়েম খান প্রমুখ নিয়মিত কনসাল্ট করতেন ময়মনসিংহ শহরের মি অজিত নিয়োগীর সঙ্গে, যিনি ছিলেন ম্যাথমেটিক্সের প্রফেসর।

আমি নিজেও ১৯৫৬-তে তার কাছে গিয়েছিলাম আমার ভবিষ্যৎ জানতে। তখন ইকনমিক্সে সদ্য এমএ পরীক্ষা দিয়েছি এবং প্রেমে পড়েছি। আমার দুটি প্রশ্ন ছিল তার কাছে- আমি বিলেত যেতে পারব কি না এবং প্রেমে সফল হব কি না?

অজিত নিয়োগী একটি শাদা কাগজে অনেক হিসাব নিকাশ করে বলেছিলেন, পরের বছরে ১৯৫৭তেই আমার বিলেত যাওয়া হবে এবং প্রেমেও সাফল্য আসবে।

তাই হয়েছিল।

কিন্তু তার পরেও আমি ভবিষ্যদ্বাণী এবং ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাদের ওপর আস্থা রাখিনি। তবে আমি আগ্রহ নিয়ে দেখেছি কিভাবে গণকরা অন্যান্যদের আস্থা অর্জন করেন এবং যথেষ্ট উপার্জনও করেন। আমার প্রয়াত বন্ধু, সাহিত্যিক, মুভি মেকার জহির রায়হানও ছিলেন একজন গণক এবং সমকালীন ছাত্রীদের খুব প্রিয়।

যেসব মাধ্যমে দেশে বিদেশে ভবিষ্যৎ গণনা করা হয় তার একটা লিস্ট নিচে দেয়া হলো। বাংলাদেশের বেকার যুবকরা ভবিষ্যৎ দর্শনকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করলে ভাল আয় করতে পারবেন হয়তো! কারণ আওয়ামী সরকারের নিরন্তর প্রচারণা বিশ্বাস করলে বলতে হবে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গিয়েছে এবং অনেক মানুষ ধনবান ও ক্ষমতাবান হয়েছেন।

উৎসাহী বেকাররা বেছে নিতে পারেন নিচের লিস্ট থেকে ভবিষ্যৎ গণনার এক বা একাধিক পদ্ধতি :

কিরোম্যানসি (Chiromancy) ও পামিস্টৃ (Palmistry)। হাত দেখা। এটাই জহির রায়হান করতেন এবং বাংলাদেশে এটাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।

অ্যালেকট্রোম্যানসি (Alectromancy)। শস্য ছিটিয়ে দিলে মুরগি কোনটা বেছে বেছে খায় সেটা দেখা।
আকাশের তারা দেখা বা এস্ট্রোনমি।
জ্যোতিষবিদ্যা। আকাশের গ্রহ ও অন্যান্য বস্তু দেখা।
অগারি (Augury) বা পাখিদের উড়ে চলার পথ দেখা।
কুষ্ঠি ও জন্মতারিখ দেখা। এটা মি অজিত নিয়োগীর বৈশিষ্ট্য ছিল।
কার্টোম্যানসি (Cartomancy)। তাস দেখা।
সিরোম্যানসি (Ceromancy)। মোমবাতি কিভাবে গলে পড়ে সেটা দেখা।
ক্রোনোম্যানসি (Chronomancy)। দিন দেখা। কুলক্ষণ ও সুলক্ষণের দিন চিহ্নিত করা।
কৃস্টালোম্যানসি (Chrystalomancy) কৃস্টাল বল দেখা।
ফেইস রিডিং (Face reading)। মুখের গড়ন ও দাগ দেখা।
জিওম্যানসি (Geomancy)। মাটি ও বালির গড়ন দেখা।
হাইড্রোম্যানসি (Hydromancy)। পানি দেখা।
কাউ চিম (Kau cim)। স্তূপীকৃত বাশের কাঠি দেখা।
লিথোম্যানসি (Lithomacny)। মণিমানিক্য দেখা।
নেকট্রোম্যানসি (Nectromancy)। মৃত ব্যক্তির আত্মাকে ডেকে আনা।
নিউমেরোলজি (Numerology)। সংখ্যা বিন্যাস দেখা।
ওনেরোম্যানসি (Oneiromancy)। স্বপ্ন বিশ্লেষণ করা।
প্যারট এস্ট্রোলজি (Parrot Astrology)। তোতা পাখি কোন তাস তুলে নেয় সেটা দেখা।
পাইরোম্যানসি (Pyromancy)। আগুনের শেইপ দেখা।
স্পিরিট বোর্ড (Spirit board)। প্লানচেট করা বা হার্ট শেইপের কাঠের বোর্ডের মাধ্যমে কারো আত্মাকে ডেকে আনা।
টাসিওম্যানসি (Tasseomancy)। চায়ের পাতা পেয়ালায় কি শেইপ নিচ্ছে সেটা দেখা।

কিছুটা কম ধনী কিন্তু কিছুটা বেশি সচেতন এক ব্যক্তির সঙ্গে গত সপ্তাহে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে এক টেবিলে আমি ছিলাম। এক পর্যায়ে তিনি আমাকে জোরালো যুক্তি দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, ‘‘খালেদা জিয়া আর দেশে ফিরবেন না। আমি বাজি রাখতে রাজি আছি।’’

খালেদা জিয়ার এই প্রত্যাবর্তন ব্যাক টু দি ফিউচার পার্ট ফোর কোনো মুভির কাল্পনিক মধুর কাহিনী নয়। এটা হচ্ছে রূঢ়, কঠিন ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাহিনী। তিনি তার একমাত্র পুত্র এবং লন্ডনে সম্প্রতি সমবেত সব নিকট আত্মীয়দের ছেড়ে স্বদেশে ফিরেছেন, বাংলাদেশের নতুন ভবিষ্যত গড়ার প্রত্যয়ে। সেই প্রত্যয়কে বাস্তবায়িত করতে হলে বিএনপিকে দ্রুত দিকনির্দেশনা দিতে হবে, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পার্টির সব স্তরে গণতন্ত্রায়ন করে এবং কাউন্সিল অধিবেশন ডেকে। ভবিষ্যদ্বাণী নয়- খালেদা জিয়াকে নতুন ভবিষ্যত গড়তে হবে।

আমি তার চ্যালেঞ্জ নেইনি। বাজিও ধরিনি। তবে আমি তাকে বলেছিলাম, ‘‘দেশে না ফেরার যেসব যুক্তি আপনি দিলেন, সে সবই অকাট্য। তবে খালেদার ক্ষেত্রে অগ্রাহ্য। হাসিনা নন খালেদা। এসব যুক্তি হাসিনার বেলায় প্রযোজ্য হতে পারে। ওয়ান ইলেভেনের পর তিনি দুইবার দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন বিদেশে আমেরিকায় তার পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে থাকতে। বাংলাদেশে তার নিরাপত্তা এবং ক্ষমতাসীন হবার বিষয় দুটি হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত করে হাসিনা দেশে ফিরে আসেন নভেম্বর ২০০৮-এ। সেই সময়ে খালেদার ওপর প্রচণ্ড চাপ আনা সত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। বাংলাদেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।’’

সেই দুঃসময়েও খালেদা বিদেশে যাননি। স্বদেশে একাকী জেলবন্দীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। এই সত্যটা কখনই ভুললে চলবে না।

সুতরাং আমার দৃঢ় বিশ্বাস খালেদা লন্ডনে কিংস্টন -আপন-টেমসে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত জীবনের বদলে স্বদেশে মামলা, বন্দিত্ব এবং অন্যান্য ঝুকিপূর্ণ জীবনেই আবার ফিরে আসবেন।

‘‘কবে?” ওই ব্যক্তিটি প্রশ্ন করেছিলেন।

‘‘সেটা আমি জানি না। তবে ফিরে যে আসবেন সেটা আমি জানি, যদি তাকে আমি ঠিকমতো বুঝে থাকি।” আমি উত্তর দিয়েছিলাম।
ওই ব্যক্তির মুখে ফুটে উঠেছিল বিজয়ীর হাসি।

আমি তাকে বলতে পারতাম, খালেদা ফিরে আসবেন আগামী এক মাস থেকে দেড় বছরের মধ্যে যে কোনো সময়ে। আমার উত্তরটা ঠিক হতো।

বছর দুয়েক আগে আমি লন্ডনে গিয়েছিলাম আমার দুই চোখের ক্যাটারাক্ট বা ছানি অপারেশনের জন্য। এপয়েন্টমেন্ট করেছিলাম হার্লি স্টৃটে প্র্যাকটিসিং এক আই সার্জনের সঙ্গে যিনি বিশ্বখ্যাত দি মুরফিল্ডস আই হসপিটালে ক্যাটারাক্ট অপারেশন করেন। এই হসপিটালে শুধু চোখেরই চিকিৎসা হয়।

ফার্স্ট কনসালটেশনে ডাক্তার বুঝিয়ে বললেন, “দুটো চোখের অপারেশন এক সঙ্গে কখনোই করা হবে না। একটি চোখ অপারেশনের পরে অন্তত দুই মাস গ্যাপ দিয়ে অন্য চোখটি অপারেশন করা হতে পারে। সেটা নির্ভর করবে প্রথম চোখ অপারেশনের এক সপ্তাহ শেষে তা পরীক্ষার পরে। যদি পেশেন্টের ডায়াবেটিস বা গ্লুকোমা থাকে তাহলে দুই মাস নয় – দেড় বা দুই বছর পরে দ্বিতীয় চোখ অপারেশন করা হতে পারে। সেটা নির্ভর করবে ডায়াবেটিস কনট্রোলে আনা এবং গ্লুকোমার সর্বশেষ পরিস্থিতি বিবেচনার পর।

এ জন্যই আমি গণনা করেছিলাম খালেদার দেশে ফেরার সবচেয়ে কাছের সময় হতে পারে নভেম্বরের শেষে অথবা ডিসেম্বরের প্রথমে। কারণ, পহেলা অক্টোবরে তার এক চোখের ক্যাটারাক্ট অপারেশন হয়েছিল সেই মুরফিল্ডস হসপিটালে। কিন্তু যেহেতু খালেদার চোখে অন্যান্য সমস্যা আগেই ছিল এবং সেটা বেড়ে গিয়েছিল এ বছরের শুরুতে গুলশানে অবরুদ্ধ থাকার সময়ে তার ওপর সরকারি পুলিশ বাহিনীর পেপার স্প্রে (Pepper Spray, উচ্চারণটি পিপার নয়- পেপার) হামলায় সেহেতু তার দ্বিতীয় চোখের অপারেশন বিলম্বিত হতে পারে। অর্থাৎ, তার দেশে ফেরার সবচেয়ে দূরের সময়টা হতে পারে দেড় থেকে দুই বছর।

তাই হয়েছে। বিএনপি থেকে প্রচারিত বিবৃতিতে জানা গেছে খালেদা জিয়া তার চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই স্বদেশে ফিরছেন।

২০ নভেম্বর ২০১৫ শুক্রবার সন্ধ্যায় যখন খালেদা জিয়াকে নিয়ে হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে এমিরেটসের এয়ারবাস এ-থৃএইট টেক অফ করে, সেই ক্ষণ থেকে খালেদার বিজয় সূচিত হয়েছে। কারণ, খালেদা আবারও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে দিয়েছেন-
এক. তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো পলাতক জীবনমুখী নন এবং
দুই. তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো ভেজাল দেশপ্রেমিক নন যিনি সর্বদাই দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেও যার বোন, পুত্র-কন্যা, পুত্রবধূ-জামাই, নাতি-নাতনিরা সবাই বিদেশে স্থায়ীভাবে থাকেন এবং যিনি নিজে সর্বদাই বিদেশ যেতে উন্মুখ থাকেন। এই মাসেই নেদারল্যান্ডস সফরের পর মাল্টা ও ফ্রান্সে হাসিনার সফরসূচি ছিল।

সুপারস্টার ফুটবলার কৃশ্চিয়ানো রোনালডো আগামী সিজনে তার বর্তমান ক্লাব রিয়াল মাদৃদ ছেড়ে অন্য ক্লাবে যোগ দেবেন কি না সে বিষয়ে তাকে সম্প্রতি প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‘ভবিষ্যৎ কেউ জানে না। আপনার ভবিষ্যতও আপনি জানেন না। আমি ভবিষ্যতে কোথাও যাবো কি না, তাও জানি না।’’

ইংরেজিতে একটা বচন আছে ‘‘হোয়ার এঞ্জেলস ডোন্ট ডেয়ার টু ট্রেড ইন”- ফুলস ওয়াক ইন (Where angels don’t dare to tread in – fools walk in)। অর্থাৎ, যেখানে দেবদূতরা পা মাড়াতে ভয় পান, সেখানে মূর্খরা স্বেচ্ছায় হেটে যান।

ভবিষ্যদ্বাণী কোনো বিজ্ঞ বা বুদ্ধিমান ব্যক্তি করেন না, অজ্ঞ ও মূর্খ ব্যক্তিরাই করেন- এই বচনটি আবারও প্রমাণিত হলো খালেদার স্বদেশ ফেরার মধ্যে দিয়ে। বাংলাদেশের আওয়ামী পলিটিশিয়ান ও আওয়ামী ঘরানার মিডিয়া, রোনালডোর কথা এবং উপরোক্ত বচনটি মনে রাখতে পারেন। কারণ খালেদা তাদের মূর্খ ও অজ্ঞ প্রমাণ করেছেন।

এখন বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, খালেদা জিয়া ফিরে এসেছেন ভবিষ্যতে- ব্যাক টু দি ফিউচার (Back to the future)-এ।

হলিউড ডিরেক্টর রবার্ট জেমেকিস ব্যাক টু দি ফিউচার নামের সিরিজে পার্ট ওয়ান, টু ও থৃ, তিনটি মুভি করেছেন। তিনি ব্যাক টু দি ফিউচার পার্ট ফোর মুভিটি করেননি।

খালেদা জিয়ার এই প্রত্যাবর্তন ব্যাক টু দি ফিউচার পার্ট ফোর কোনো মুভির কাল্পনিক মধুর কাহিনী নয়। এটা হচ্ছে রূঢ়, কঠিন ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাহিনী। তিনি তার একমাত্র পুত্র এবং লন্ডনে সম্প্রতি সমবেত সব নিকট আত্মীয়দের ছেড়ে স্বদেশে ফিরেছেন, বাংলাদেশের নতুন ভবিষ্যত গড়ার প্রত্যয়ে। সেই প্রত্যয়কে বাস্তবায়িত করতে হলে বিএনপিকে দ্রুত দিকনির্দেশনা দিতে হবে, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পার্টির সব স্তরে গণতন্ত্রায়ন করে এবং কাউন্সিল অধিবেশন ডেকে। ভবিষ্যদ্বাণী নয়- খালেদা জিয়াকে নতুন ভবিষ্যত গড়তে হবে।

ইতিমধ্যে বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা এবং পার্টির বাইরে অন্যরা যারা বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একমাত্র নেতা খালেদা জিয়াই তারা সবাই এক বাক্যে বলবেন ‘ওয়েলকাম ব্যাক, লেট আস অল গো ব্যাক টু দি ফিউচার।’

২১ নভেম্বর ২০১৫।

(বানান রীতি লেখকের নিজস্ব )

শফিক রেহমান: প্রখ্যাত সাংবাদিক, টিভি অ্যাঙকর, বিবিসির সাবেক কর্মী (১৯৫৭-১৯৯১), লন্ডনে বহুভাষাভিত্তিক স্পেকট্রাম রেডিও-র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও (১৯৮৭-১৯৯২)। fb.com/ShafikRehmanPresents

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *