‘লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া’ ওমর শরিফ আর নেই

চলে গেলেন ওমর শরিফ। মিশরের রাজধানী কায়রোর এক হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার তার মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

চলে গেলেন ওমর শরিফ। মিশরের রাজধানী কায়রোর এক হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার তার মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।চলে গেলেন ওমর শরিফ। মিশরের রাজধানী কায়রোর এক হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার তার মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

তার এজেন্ট জানিয়েছেন, তিনি কায়রোয় তার বাড়িতে অবসর জীবন কাটাচ্ছিলেন। দীর্ঘ দিন ধরে অ্যালঝাইমার্সে ভুগছিলেন। এ দিন বুকে যন্ত্রণা অনুভব করায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়।

মিশরের চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করলেও পরে হলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা হয়ে ওঠেন তিনি। ‘লরেন্স অব আরবিয়া’, ‘ডক্টর জিভাগো’, ‘ম্যাকানস গোল্ড’-এর মতো একের পর এক ছবির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাকে। এ বছরেই তার অ্যালঝাইমার্স ধরা পড়ে।

গত মে মাসে তিনি মিশরে তাঁর পৈত্রিক বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করেন। সেখানেই তার চিকিত্‍সা চলছিল। ১৯৩২ সালে আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মিশরে বড় হওয়ার সুবাদে আরবি ভাষায় তো পারদর্শী ছিলেনই, সঙ্গে স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, গ্রিক এবং ফ্রেঞ্চ ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন। ১৯৫০-এর দশকে তিনি হলিউডে নিজের অভিনয় জীবন শুরু করেন।

ক্রমেই নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের হৃদয় জয় করেন শরিফ। ‘৬০-এর দশকে তার অভিনীত বেশ কিছু চরিত্র স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। ১৯৬৩ সালে ‘লরেন্স অফ অ্যারেবিয়া‘ ছবির জন্য অস্কারের মঞ্চে মনোনীত হন তিনি। অস্কার না জিতলেও ওই একই ছবির জন্য গোল্ডেন গ্লোব জেতেন তিনি। পরে ‘ড. জিভাগো’-র জন্যেও গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার দেওয়া হয় তাকে। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হিডালগো’ ছবিতেও অসাধারণ অভিনয় করেন তিনি। তার আরও একটি দিক না বললেই নয়। ওমর শরিফ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কনট্র্যাক্ট ব্রিজ খেলোয়াড় হিসাবে স্বীকৃত ছিলেন। তার প্রয়াণে হলিউডের বহু তারকা শোক জ্ঞাপন করেছেন।

জীবনে শুধু একজনকেই ভালোবেসেছিলাম

হলিউডের স্বর্ণযুগের শেষ মহানায়কদের অন্যতম। বিশ্বে তিনিই একমাত্র অভিনেতা যিনি নাৎসি কর্নেল, ইহুদি, মুসলিম, খ্রিষ্টান, পাদ্রি, মরুভূমির আরব এবং অস্ট্রিয়ান প্রিন্স চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

তার শক্তিশালী দৃষ্টি মুহূর্তেই আপনাকে বশ করে ফেলবে, মরুভূমির মৃদুমন্দ বাতাসের তাপে চোখ দু’টি সব সময়ই জ্বলতে থাকে। লরেন্স অব অ্যারাবিয়ায় আলী ইবনে আল খারিশের যে চরিত্র তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন, এখনো তাকে দেখে তার কথাই মনে পড়ে।

ওই চরিত্রটিই ছিল তার আন্তর্জাতিক তারকা খ্যাতির পাসপোর্ট। বছরটি ডেভিড লিনের সাড়া জাগানো চলচ্চিত্রটির ৫০ বর্ষপূর্তি হিসেবে পালিত হচ্ছে। সময়ের পরিক্রমায় তিনি শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তবে মনেপ্রাণে তিনি যাযাবরই থেকে গেছেন। উট নিয়ে মরুভূমিতে বেড়াতে বেরিয়ে না পড়লেও তিনি এক হোটেল থেকে অন্য হোটেলে দিন কাটিয়েছেন।

তিনি অতীত রোমন্থনে মেতে উঠেছে, বলেছেন তার উত্থান-পর্ব, সৌভাগ্য ধরা দেয়ার কথা। তার এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছিলে রিডার্স ডাইজেস্ট-এ।

আপনি প্রায়ই বলেন, আপনি আপনার কোনো ছবি নিয়েই পুরোপুরি তৃপ্ত নন। বিষয়টা কী?
ওমর শরিফ: কেউ কি জীবনে আসলেই পুরোপুরি তৃপ্তি পায়? আমার কেবল কয়েকটি ছবির প্রতি কিছুটা ভালো লাগা বোধ আছে : লরেন্স অব অ্যারাবিয়া অবশ্যই, তবে ড. জিভাগোও ভালো লাগে। আমি নিজে তো সেন্টিমেন্টাল টাইপের, এ কারণেই হয়তো। বারবারা স্ট্রেইস্যান্ডের সাথে করা ফানি গার্লের কথাও বলা যায়। আমাদের তখন দারুণ সময় কেটেছে। আসলে আমরা প্রায় বিয়েই করে ফেলেছিলাম। তবে আমিই শেষ পর্যন্ত না বলেছিলাম। কারণ ও চেয়েছিল আমেরিকায় থাকতে, আর আমি প্যারিসে!

আপনি যেসব নারীর বিপরীতে অভিনয় করেছেন, তাদের প্রায় সবারই প্রেমে মজে যেতেন?
ওমর শরিফ: ভালোবাসা! না আমি আসলে জীবনে এক নারীকেই ভালোবেসেছিলাম আমার স্ত্রীকে (ফাতিন হামামা, মিসরের প্রখ্যাত নায়িকা)। অবশ্য, তবুও তাকে ছেড়েছি।

লরেন্স অব অ্যারাবিয়া ছবিতে আপনার ভূমিকার জন্য কাকে ধন্যবাদ দেন।
ওমর শরিফ: ভাগ্যকে। তবে আমার মায়ের ভূমিকাও ছিল। ডেভিড লিন একজন ইংরেজিভাষী আরবকে চেয়েছিলেন। আর আমার মা-ই আমাকে ইংরেজি শেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। আমার যখন বয়স ১০, তখন আমি ভয়ঙ্কর রকমের মোটা হয়ে পড়েছিলাম। খেতাম সব সময়ই, আর জেসুইটদের পরিচালিত যে স্কুলে আমি পড়তাম, সেখানে আমরা খেলাধুলা করতাম না। তিনি তার একমাত্র ছেলেকে (তার মধ্যে তিনিই অনেক উচ্চাকাক্সার বীজ পুঁতে দিয়েছিলেন) এমন কুৎসিৎ অবস্থায় দেখে হতাশ হলেন। আমাকে এমন এক দেশে বোর্ডিং স্কুলে পাঠালেন, যেখানে খাবার প্রলোভিত করত না। দেশটার নাম ইংল্যান্ড! মিশন সফল হলো। আমার চর্বি সব ঝরে গেল। আর স্কুলে যেহেতু থিয়েটার ছিল, আমি নতুন একটি ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়লাম।

আপনার কি মনে হয়, মধ্যপ্রাচ্যে জন্মগ্রহণ করায় আপনি অত্যন্ত বিশেষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছেন?
ওমর শরিফ: বিষয়টা নিয়ে আমি ভাবিনি। এটা সত্য, আমি মিসরে জন্মেছিলাম। তবে লরেন্স অব অ্যারাবিয়ায় অভিনয়ের পরই আমি হলিউডে পাড়ি জমিয়েছিলাম, সাত বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলাম। যা জানতাম, তা হলো, আমি গৃহহারা অভিনেতা। বিশ্বে আমিই একমাত্র অভিনেতা যে নাৎসি কর্নেল (দ্য নাইট অব দ্য জেনারেলস, অ্যানাটোল লিটভ্যাক পরিচালিত) এবং নিউ ইয়র্কের ইহুদি (ফানি গার্ল), মুসলিম, খ্রিষ্টান, পাদ্রি, মরুভূমির আরব এবং অস্ট্রিয়ান প্রিন্সের (মেয়ারলিং) ভূমিকায় অভিনয় করেছে। আপনি কি বিষয়টা কল্পনা করতে পারেন? আমি, একজন আরব, অস্ট্রিয়ান হিসেবে অভিনয় করেছি।

লরেন্স অব অ্যারাবিয়া আপনি কি এটা আবার দেখবেন?
ওমর শরিফ : ছবিটা মুক্তির পর আমি আর কখনো দেখিনি। আসলে আমি আমার কোনো ছবিই দেখিনি। আর ১৫ বছরে আমি সিনেমা দেখতে গেছি মাত্র দু’বার! আমি সিনেমা পছন্দ করি না, কারণ এগুলো কিভাবে বানানো হয়, আমি জানি। আমি বরং থিয়েটার পছন্দ করি। অভিনেতারা ভুল করে, কিন্তু তবুও তারা অন্তত আমাদের সামনে ‘জীবন্ত’, অনেক আগে রেকর্ড করা নয়। তবে আমি টিভি সিরিজ দেখতে পছন্দ করি।

আপনার জীবন যদি আবার নতুন করে শুরু হয়, আপনি কি কোনো বিশেষ স্বাদ পূরণ করার চেষ্টা করবেন?
ওমর শরিফ : সম্ভবত করব। তবে কী করব, তা বলব না। আমি কিছু অপছন্দ করলে সেটা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারি, কেবল সুখস্মৃতিই মনে রাখি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *