ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি মসজিদ
সাময়িকী

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি মসজিদ

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি মসজিদ নিয়ে এই লেখাটি। জেনে নিন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কিছু মসজিদ সম্পর্কে।

বায়তুল মুকাররম মসজিদ
বায়তুল মুকাররম বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ। পাকিস্তানের বিশিষ্ট শিল্পপতি লতিফ বাওয়ানি ও তার ভাতিজা ইয়াহিয়া বাওয়ানির উদ্যোগে এই মসজিদ নির্মাণের পদক্ষেপ গৃহীত হয়।

আব্দুল লতিফ ইব্রাহিম বাওয়ানি প্রথম ঢাকাতে বিপুল ধারণক্ষমতাসহ একটি গ্র্যান্ড মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন। ১৯৫৯ সালে ‘বায়তুল মুকাররম মসজিদ সোসাইটি’ গঠনের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার মিলনস্থলে মসজিদটির জন্য জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। স্থানটি নগরীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র থেকেও ছিল নিকটবর্তী। বিশিষ্ট স্থপতি টি. আব্দুল হুসেন থারিয়ানিকে মসজিদ কমপ্লেক্সটির নকশার জন্য নিযুক্ত করা হয়। পুরো কমপ্লেক্স নকশার মধ্যে দোকান, অফিস, লাইব্রেরি ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এই মসজিদে একসঙ্গে ৪০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের প্রধান কক্ষটি তিন দিকে বারান্দা দিয়ে ঘেরা। মিহরাবটি অর্ধ-বৃত্তাকারের পরিবর্তে আয়তাকার। আধুনিক স্থাপত্যে কম অলংকরণই একটি বৈশিষ্ট্য-যা এই মসজিদে লক্ষনীয়। এর অবয়ব অনেকটা পবিত্র কাবা শরিফের মতো হওয়ায় মুসলমানদের হৃদয়ে এই মসজিদটি আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

কাকরাইল মসজিদ
কাকরাইল মসজিদ ঢাকার কাকরাইল এলাকায় রমনা পার্কের পাশে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের মারকায বা প্রধান কেন্দ্র। ১৯৫২ সালে এই মসজিদটি তাবলীগ জামাতের মারকায হিসেবে নির্ধারিত হয়। মসজিদটির আদি নাম ছিল মালওয়ালি মসজিদ।

নবাব পরিবারের যে কোন একজন সম্মানিত ব্যক্তি মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। অনেকের ধারণা ৩০০ বছর আগে এ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মসজিদটি নবাবদের অন্যান্য স্থাপনার সাদৃশ্যেই নির্মিত ছিল। শুরুতে মসজিদটি স্বল্প পরিসরে ছিল। সামনে ছোট্ট একটি পুকুর ছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, চল্লিশের দশকে রমনা পার্কের মালিগণ টিন দিয়ে ছোট একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬০-এর দশকে তাবলীগ জামাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ইঞ্জিনিয়ার মরহুম হাজী আব্দুল মুকিতের তত্ত্বাবধানে তিন তলা মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করেন।

বর্তমান মসজিদের জায়গায় পূর্বে নবাব পরিবারের নির্মিত একটি মসজিদ ছিল। যার অস্তিত্ব এখন আর নেই। বর্তমানের মসজিদটি ইঞ্জিনিয়ার মরহুম হাজী আব্দুল মুকিতের নকশায় নির্মিত। মসজিদের ছাদ সংলগ্ন ত্রি-ভুজ আকৃতির কারুকাজ রয়েছে। মসজিদটির স্তম্ভগুলো চৌকোণা আকৃতির। মসজিদের পশ্চিম দিকের দেয়ালটি ঢেউ খেলানো। এছাড়াও মসজিদটির তিন দিকে প্রশস্ত বারান্দা রয়েছে। দক্ষিণ ও উত্তর পাশে মুসল্লিদের অজু করার জন্য দুটি পুকুরসাদৃশ্য হাউজ রয়েছে। এ পুকুরের চতুষ্পার্শে শতাধিক লোক একত্রে ওজু করতে পারেন। এছাড়া মসজিদের বাইরেও অজু করার আধুনিক ব্যবস্থা আছে। মসজিদ থেকে একটু দূরে উত্তর দিকে টয়লেট এবং বাথরুমের জন্য রয়েছে দোতলা একটি ভবন।

তারা মসজিদ
তারা মসজিদ পুরানো ঢাকার আরমানিটোলায় আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত।

সাদা মার্বেলের গম্বুজের ওপর নীলরঙা তারায় খচিত এ মসজিদ নির্মিত হয় আঠারো শতকের প্রথম দিকে।

মসজিদের গায়ে এর নির্মাণ-তারিখ খোদাই করা ছিল না। জানা যায়, আঠারো শতকে ঢাকার ‘মহল্লা আলে আবু সাঈয়ীদ’-এ (পরে যার নাম আরমানিটোলা হয়) আসেন জমিদার মির্জা গোলাম পীর (মির্জা আহমদ জান)। ঢাকার ধণাঢ্য ব্যক্তি মীর আবু সাঈয়ীদের নাতি ছিলেন তিনি। মির্জা গোলাম পীর এ মসজিদ নির্মাণ করেন। ‌ মির্জা সাহেবের মসজিদ হিসেবে এটি তখন বেশ পরিচিতি পায়। ১৮৬০ সালে মারা যান মির্জা গোলাম পীর। ১৯২৬ সালে ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী, আলী জান বেপারী মসজিদটির সংস্কার করেন। সে সময় জাপানের রঙিন চিনি-টিকরি পদার্থ ব্যবহৃত হয় মসজিদটির মোজাইক কারুকাজে।

মোঘল স্থাপত্য শৈলীর প্রভাব রয়েছে এ মসজিদে। ঢাকার কসাইটুলীর মসজিদেও এ ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। উল্লেখ্য, দিল্লি, আগ্রা ও লাহোরের সতের শতকে নির্মিত স্থাপত্যকর্মের ছাপ পড়ে মোঘল স্থাপত্য শৈলীতে।

মির্জা গোলামের সময় মসজিদটি ছিল তিন গম্বুজঅলা, দৈর্ঘ্যে ৩৩ ফুট (১০.০৬ মিটার) আর প্রস্থে ১২ ফুট (৪.০৪ মিটার)। আলী জানের সংস্কারের সময় ১৯২৬ সালে মসজিদের পূর্ব দিকে একটি বারান্দা বাড়ানো হয়। ১৯৮৭ সালে তিন গম্বুজ থেকে পাঁচ গম্বুজ করা হয়। পুরনো একটি মেহরাব ভেঙে দুটো গম্বুজ আর তিনটি নতুন মেহরাব বানানো হয়।
মসজিদের বতর্মান দৈর্ঘ্য ৭০ ফুট (২১.৩৪ মিটার), প্রস্থ ২৬ ফুট (৭.৯৮ মিটার)।

চকবাজার শাহী মসজিদ
চকবাজার শাহী মসজিদ বাংলাদেশের রাজধানীর পুরানো ঢাকা এলাকার চকবাজারে অবস্থিত একটি মোগল আমলের মসজিদ। মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান এটিকে ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন, মসজিদে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে এই ধারণা করা হয়। এই মসজিদটিই সম্ভবত বাংলায় উঁচু প্লাটফর্মের উপর নির্মিত প্রাচীনতম ইমারত-স্থাপনা। প্লাটফর্মটির নিচে ভল্ট ঢাকা কতগুলো বর্গাকৃতি ও আয়তাকৃতি কক্ষ আছে। এগুলোর মাথার উপরে খিলান ছাদ রয়েছে, যার উপরের অংশ অবশ্য সমান্তরাল। ধারণা করা হয়, এই মসজিদের প্লাটফর্মের নিচের কক্ষগুলোতে মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের আবাসন ছিল, এধরণের ভবনগুলোকে বলা হয় ‘আবসিক-মাদ্রাসা-মসজিদ’।

মসজিদটির আদি গড়নে ছিল তিনটি গম্বুজ। অবশ্য বিভিন্ন সময়ে সংস্কারকার্য ও নির্মাণ সম্পাদনের ফলে বর্তমানে এর আদি রূপটি আর দেখা যায় না। মসজিদের ভিতরকার নকশা তিনটি বে’তে বিভক্ত ছিল, যার মাঝখানের বে ছিল বর্গাকার, কিন্তু দুপাশের বে ছিল আয়তাকার। তিনটি বে’র উপরেই গম্বুজ দিয়ে আচ্ছাদিত ছিল, মাঝখানের গম্বুজটি ছিল তুলনামূলক বড় আকৃতির। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি অষ্টকোণাকৃতির, যা সংস্কারের পরে আজও সেরকমটাই রয়েছে।

মসজিদটিতে একটি শিলালিপি রয়েছে, যেখানে মসজিদের ইতিহাস সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। হরিনাথ দে এই লেখাটির অনুবাদ করেছেন –
“The Ameer of Ameers who cleaves to the right
masjid Shaista did built in God’s right,
I said to the seeker enquiring its date
Accomlished We know Was God’s bidding”

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *