বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মুভি মোগল’ এ কে এম জাহাঙ্গীর খান
বিনোদন

বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মুভি মোগল’ এ কে এম জাহাঙ্গীর খান

ছবির মানুষটিকে আমার সমবয়সী বাংলা সিনেমাপাগল দর্শকদের অনেকে ও বর্তমান প্রজন্মের দর্শকরা দেখা মাত্রই চিনতে পারবেনা। কিন্তু আমার সমবয়সী পুরনো বাংলা সিনেমার দর্শকরা নাম বলা মাত্রই মানুষটিকে চিনতে পারবেন। কারণ বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও পরিপূর্ণ একজন সফল প্রযোজক হলেন তিনি যার নাম এ কে এম জাহাঙ্গীর খান।

বহু সফল বাণিজ্যিক ও ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্রের প্রযোজক এবং পরিবেশক তিনি যার নাম পর্দায় দেখেনি এমন দর্শক খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার দেখা বাংলা চলচ্চিত্রে মেধাবী ও পরিপূর্ণ একজন প্রযোজক হলে এ কে এম জাহাঙ্গীর খান। জাহাঙ্গীর খানের প্রভাব চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে এমনই ছিলো যে তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মুভি মোগল’ খেতাবে ডাকা হতো এবং চলচ্চিত্রের সকল জুনিয়র শিল্পী কলাকুশলীরা ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতো।

আলমগীর পিকচার্সের কর্নধার হলেন এই এ কে এম জাহাঙ্গীর খান। যে প্রতিষ্ঠান থেকে নির্মিত হয়েছিলো ‘মেঘের অনেক রঙ’, ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘দি ফাদার’, ‘বসুন্ধরা’, ‘শুভদা’র মতো মাস্টারপিস চলচ্চিত্রগুলো ঠিক তেমনি নির্মিত হয়েছিলো ‘বিজয়িনী সোনাভান’ , ‘রসিয়া বন্ধু’, ‘সওদাগর’,‘রঙিন রুপবান’, ‘নয়নমণি’, ‘চন্দ্রনাথ’,‘ভেলুয়া সুন্দরী’,‘আলীবাবা চল্লিশ চোর’, ‘চাকর’, ‘প্রেম দিওয়ানা’, ‘বাবার আদেশ’, ‘ডিস্কো ড্যান্সার’, ‘বশিরা’, ‘খলনায়ক’ এর মতো চরম বাণিজ্যিক মাশালাদার চলচ্চিত্রও। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ও বিকল্পধারা সব ছবিতেই ছিল আলমগির পিকচার্সের প্রভাব।

এ কে এম জাহাঙ্গীর খানের প্রভাব চলচ্চিত্রে কেমন ছিলো তাঁর জন্য নিচে দুটো ঘটনা উল্লেখ করছি যা থেকে বুঝতে পারবেন জাহাঙ্গীর খানের কাছ থেকে সাড়া না পাওয়াটা ছিলো তখনকার পরিচালক ও শিল্পী কলাকুশলিদের জন্য এক বিরাট ধাক্কা। কারণ তখন সবাই চাইতো এ কে এম জাহাঙ্গীর খানের প্রযোজিত চলচ্চিত্রে কাজ করতে।

১৯৭৮ সালের দিকে এই আলমগীর পিকচার্সের জন্য অখ্যাত ও নবীন কাজী হায়াত নিজের জীবনের প্রথম সিনেমা ‘দি ফাদার’ নির্মাণ করলেন। কাজী ছিলেন প্রখ্যাত পরিচালক আলমগীর কবিরের শিষ্য। ‘দি ফাদার’ ছিল বাণিজ্যিক ধারার মাঝে একটু অন্যরকম একটি চলচ্চিত্র যার গল্পটি ছিল অনেক আধুনিক ও সময়ের চেয়েও এগিয়ে। অথচ বক্স অফিসে ‘দি ফাদার’ মুখ থুবড়ে পরেছিল। আলমগীর পিকচার্স যা মানতে পারেনি। এ কে এম জাহাঙ্গীর খান তরুন কাজী হায়াতকে আলমগীর পিকচার্সের অফিসে নিষিদ্ধ করে দিলেন। এই নিষিদ্ধতাই নতুন এক কাজী হায়াতের জন্ম দেয়। কাজী সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি এখন থেকে বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাণ করবেন এবং অন্যদের চেয়ে আলাদা হবে সেই ছবিগুলোর ধরন যার ফলশ্রুতিতে আমরা কাজী হায়াতের কাছ থেকে পেয়েছিলাম ‘খোকনসোনা’, ‘মনাপাগলা’, ‘পাগলী’, ‘দায়ী কে’, ‘যন্ত্রণা’, ‘দাঙ্গা’, ‘সিপাহি’, ‘ত্রাস’, ‘চাঁদাবাজ’, ‘দেশপ্রেমিক’, ‘লাভ স্টোরি’, ‘লুটতরাজ’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘তেজী’, ‘ধর’, ‘আম্মাজান’ এর মতো ব্যতিক্রমধর্মী ও সাহসী সব চলচ্চিত্রগুলো। কাজী পেয়েছিলেন একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

নায়ক মান্না তখনও চলচ্চিত্রের সাইড নায়ক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি প্রায় সময় আলমগীর পিকচার্সের অফিসে গিয়ে এ কে এম জাহাঙ্গির খানের দেখা পাওয়ার আশায় বসে থাকতেন। দিনের পর দিন আলমগীর পিকচার্স অফিসে ধরনা দিলেও এ কে এম জাহাঙ্গির খানের দেখা মান্না পায়নি। মান্না ভেবে নিলেন আলমগীর পিকচার্সের সিনেমায় আর কাজ করা হলো না। ১৯৯১ সালে মোস্তফা আনোয়ারের ‘কাশেম মালার প্রেম’ যখন সুপারহিট হলো তখন একদিন মান্নার বন্ধু পরিচালক মমতাজুর রহমান আকবর আলমগীর পিকচার্সের অফিসে মান্নাকে বসে থাকতে দেখে এ কে এম জাহাঙ্গির খানের কাছে নিয়ে যান। আকবর তখন আলমগীর পিকচার্সের সুপারহিট ‘চাকর’ সিনেমার জন্য এ কে এম জাহাঙ্গির খানের খুব কাছের লোক। আকবর প্রস্তাব করলেন যে আলমগীর পিকচার্সের আগামী সিনেমা ‘প্রেম দিওয়ানা’তে মান্নাকে প্রধান হিরো হিসেবে কাস্ট করতে। জাহাঙ্গীর খান রাজী হয়ে গেলেন। অবশেষে মান্নার অনেক দিনের ইচ্ছে পূরণ হলো। দেশের স্বনামধন্য প্রযোজনা সংস্থার কোন ছবিতে প্রধান নায়ক হিসেবে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে মান্না উচ্ছসিত। মমতাজুর রহমান আকবরের ‘প্রেম দিওয়ানা’ ছিল মডার্ন লাভ স্টোরি টাইপের চলচ্চিত্র যা মুক্তি পাওয়ার পর বাম্পারহিট হয়েছিল। ব্যস, এরপর আলমগীর পিকচার্স যতদিন নতুন সিনেমা নির্মাণ করেছিল তার সবগুলোতে প্রধান হিরো ছিলেন মান্না । একে একে আলমগীর পিকচার্স থেকে মুক্তি পেতে থাকে ‘বাবার আদেশ’, ‘ ডিস্কো ড্যান্সার’, ‘ বশিরা’, ‘খলনায়ক’ এর মতো বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্রগুলো যার সবগুলোই ছিল ব্যবসায়িক ভাবে সুপারহিট।যে সিনেমাগুলো ৯০ দশকের নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে মান্নাকে করেছিল সবার চেয়ে আলাদা কিছু, সালমান–সানির মতো তরুন জনপ্রিয় নায়কদের ভিড়ে মান্না হয়ে গেলেন আলাদা ক্রেজ যিনি পরবর্তীতে দর্শক ও ভক্তদের কাছে সোনালি প্রজন্মের শেষ ‘মহানায়ক’ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন এবং জীবনের শেষ ১০টি বছর মান্না ছিলেন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে ‘ওয়ান ম্যান শো’।

একটি প্রযোজনা সংস্থা শুধু সিনেমার পর্দায় দারুন দারুন সিনেমা দেয়া ছাড়াও যে পর্দার বাহিরে তারকা নির্মাণে অবদান রাখতে পারে সেটা শ্রদ্ধেয় জাহাঙ্গীর খান সাহেবের ‘আলমগীর পিকচার্স’ তার প্রমাণ।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *