একরাম হত্যার এক বছর: সুবিচারের আশাও নেই

ফেনী ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামুল হক একরাম হত্যার এক বছর পার হলেও আতংক কাটেনি তার পরিবার ও স্বজনদের মাঝে।

ফেনী ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামুল হক একরাম হত্যার এক বছর পার হলেও আতংক কাটেনি তার পরিবার ও স্বজনদের মাঝে। ফেনী ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামুল হক একরাম হত্যার এক বছর পার হলেও আতংক কাটেনি তার পরিবার ও স্বজনদের মাঝে। শুধু তাই নয় দলে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতরাও নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে করেন। ফের কোনো অঘটনের আশঙ্কায় তার পরিবার কিংবা স্বজনরা এনিয়ে মুখ খুলতে নারাজ।

মামলার খোঁজখবর তো দূরের কথা বর্বরোচিত এ হত্যার সুবিচারের আশাও নেই তাদের।
সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো আঁতকে উঠে ফেনীবাসী।

২০১৪ সালের ২০ মে সকাল ১০ টা ৫০ মিনিটের দিকে ফেনী শহরের মিজান রোডস্থ ডায়াবেটিস হাসপাতাল থেকে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের একটি সভায় যোগদানের উদ্দেশে বের হন একরাম। শহরের বিলাসী সিনেমার নিকট পৌঁছলে প্রথমে একটি ময়লার ট্রলি দিয়ে তাকে বহনকারী প্রাডো গাড়ির গতিরোধ করার চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। ট্রলিটি চাপা দিয়ে পার হওয়ার সময় গাড়িটির এক চাকা সড়ক ডিভাইডারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে উপরে উঠে যায়। এ সময় চতুর্দিক থেকে গুলি ও বোমা ফাটিয়ে একদল দুষ্কৃতিকারী তার গাড়িটি ঘেরাও করে। গুলি করে হত্যার পর তাকে বহনকারী গাড়িতে আগুন ধরিয়ে লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়। বিভৎস এ হত্যাযজ্ঞের ঘটনা দেশ-বিদেশে বেশ আলোচিত হয়। ওই দিনটির কথা মনে পড়লে এখনো আঁতকে উঠে ফেনীর মানুষ।

এখনো বাবা ফেরার অপেক্ষায় ওরা
ছোট্ট শিশু লামিরা জানে না তার বাবা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাসিন ও ফুলও অপেক্ষায় থাকে বাবা ফিরে আসার। বাবার কথা মনে পড়লেই দেয়ালে সাঁটানো ছবির দিকেই ছুটে যান শিশু সন্তান তাসিন, ফুল ও লামিরা। অ্যালবামের ছবি বুকে নিয়ে কখন বাবা আসবে এমন প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে অবুঝ তিন সন্তান। বাবা আসবে না এমনটি বড় সন্তান তাসিন কিছুটা বুঝলেও অন্যরা তা জানে না। বাবার ছবি হাতে নিয়ে চুমু খায়, আদর করে। স্বামী হারা তাসনিমও অবুঝ সন্তানদের নানাভাবে বাবার শূন্যতা বুঝতে না দেয়ার চেষ্টা করেন।

একরামের নাম মুখে নিতেও ভয়
একরামুল হক একরাম দীর্ঘ সময় ফেনী জেলা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। পরে ফেনী পৌর যুবলীগের সভাপতি ও ২০১১ সালের সম্মেলনে নিজ উপজেলা ফুলগাজী আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ফুলগাজীর আনন্দপুরের নুরুল হক মাস্টারের ছেলে একরাম। একসময়ে জয়নাল হাজারীর স্টিয়ারিং কমিটির সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন।

১৯৯৭ সালে ফুলগাজীর আনন্দপুর ইউপি নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্ধীতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে জয়নাল হাজারী দেশান্তরী হওয়ার পর ক্রমেই তার সঙ্গ ত্যাগ করে ফেনী আওয়ামী লীগে ভিন্ন মেরুকরনের সূত্রপাত করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জয়নাল হাজারী দেশে ফিরলেও একরাম ও যুবলীগ নেতা নিজাম হাজারীদের তোপের মুখে দাঁড়াতে পারেননি একসময়ের গুরু জয়নাল হাজারী।

২০০৯ ও ২০১২ সালে পরপর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান হন একরাম। নিজ দলের তো নয়ই ভিন্ন দলের প্রতিদ্বন্দ্বিরাও তার দাপটের কাছে টিকেনি। কিন্তু সেই দলীয় নেতাকর্মীদের রোষানলের শিকার হয়ে ২০১৪ সালের ২০ মে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন একরাম। হত্যার পর দলের একটি অংশ প্রতিবাদমুখর হলেও বছর ঘুরতে তাদের মুখেও কুলুপ।

একরাম পরিবারের খোঁজ নেয় না কেউই
বিছানা পরিপাটি, পোশাক-আশাকও রয়েছে আলনায় সাজানো, সবকিছুই রয়েছে আগের মত, নেই শুধু পরিবারের মধ্যমনি। হত্যার এক বছর পূর্ণ হতে চলেছে আজ। তার কথা মনে উঠতেই গুমরে কেঁদে উঠেন স্ত্রী তাসনিম আক্তার। শহরের মাস্টার পাড়ার বাসায় কথা বলতে চাইলে তাসনিম কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন।

তিনি বলেন, “আমাদের খোঁজ এখন আর কেউ নেয় না। এ হত্যার সুবিচার নিয়ে সংশয় এ পরিবারের সদস্যদের।”

স্ত্রী তাসনিম বলেন, “আমরা আল্লাহর কাছে বিচার চাই। ফেনীর আকাশ-বাতাস, বালুক না সবাই জানে কে এ ধরনের বর্বর হত্যা ঘটিয়েছে।”

পুরো পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে জানিয়ে বলেন, “প্রতিটি মুহূর্ত আতংকের মধ্যে দিন কাটছে। সরকার আমাদের নিরাপত্তা দিলে একরামের খুনীদের আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিতে পারব।”

কারাগারে আওয়ামী লীগ-যুবলীগের ৩০ নেতাকর্মী
একরাম হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জামিনে বেরিয়েছে পাঁচজন। এদের মধ্যে জামিন বাতিলের পর দুইজন পলাতক রয়েছে।

মামলায় ৫৪ জনকে অভিযুক্ত করে ২৮ আগস্ট চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফেনী মডেল থানার তৎকালীন ওসি (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ। তিনি জানান, ওই ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি, চুরি, রামদা, মোটর সাইকেল, প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছিল। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ১৬ জন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা মাহতাব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী মিনার ছাড়া অপরাপরদের সবাই আওয়ামী লীগ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মী। এদের মধ্যে ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক জাহিদ চৌধুরী ও আনন্দপুর ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন পাটোয়ারীকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে।

অন্য গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক জাহাঙ্গীর আদেল, ফেনী পৌর কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহিল মাহমুদ শিবলু, ফেনী পৌর যুবলীগের সদ্য সাবেক যুগ্ম-আহবায়ক জিয়াউল আলম মিস্টার, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লায়লা জেসমিন বড় মনির ছেলে আবিদ রয়েছে।

মৃত্যুবার্ষিকী পালনে নেই কোনো কর্মসূচি
আজ বুধবার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। দিবসটি উদ্যাপনে দলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্তও কোনো কর্মসূচি জানা যায়নি। তবে ঘরোয়াভাবে তার পরিবার মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে বলে পরিবার সূত্র জানিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *