ইইউ ছাড়ছে ব্রিটেন, পদত্যাগ করছেন ক্যামেরন
আন্তর্জাতিক

ইইউ ছাড়ছে ব্রিটেন, পদত্যাগ করছেন ক্যামেরন

ইইউ ছাড়ছে ব্রিটেন, পদত্যাগ করছেন ক্যামেরনযুক্তরাজ্য আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে থাকছে না। ঐতিহাসিক গণভোটে দেশটির বেশিরভাগ জনগণ ‘বেক্সিট’র (BREXIT) পক্ষে রায় দিয়েছেন। ব্রিটিশ জনগণের ৫২ শতাংশ ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে ইইউতে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৪৮ শতাংশ ভোটার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।

১৯৯২ সালের নির্বাচনের পর দেশটির ইতিহাসে যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ এই গণভোটে অংশ নিয়েছেন। ভোট পড়েছে প্রায় ৭২ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রায় সাড়ে ৩ কোটি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। সর্বশেষ দেখা গেছে, ইইউ ত্যাগের পক্ষে ১ কোটি ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৭৪২ ভোট পড়েছে। অন্যদিকে বিপক্ষে পড়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ২৪১ ভোট।

নির্বাচনের দিন আন্তর্জাতিক লেনদেনে ইউরো এবং স্টার্লিংয়ের দর এ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দেশটিতে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভোট গণনা শেষে শুক্রবার ফলাফল আসতে থাকে।

ভোটে দেখা গেছে, লন্ডন এবং স্কটল্যান্ডবাসী ইইউতে থাকার পক্ষে কঠিন অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু উত্তর ইংল্যান্ডের ভোটারদের কাছে এই পরিকল্পনা মার খেয়েছে।

ওয়েলস, ইংলিশ শায়ার এবং ইংল্যান্ডের বাইরের অংশের বড় সংখ্যক ভোটার বেক্সিটের পক্ষে রায় দিয়েছেন।

গণভোটে রায় পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টির নেতা নাইজেল ফ্যারেজ এটিকে যুক্তরাজ্যের ”স্বাধীনতা দিবস” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিগত ২০ বছর ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে আসার পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালান নাইজেল ফ্যারেজ।

রায় আসার পর তিনি বলেন, ‘২৩ জুন আমাদের ইতিহাসে ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে।’

গণভোটের ফলাফলকে ফ্যারেজ ‘সাধারণ মানুষের, শালীন লোকের জয়’ বলেও মন্তব্য করেন।

তিনি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে ‘অবিলম্বে’ পদত্যাগ করার দাবি জানান।

যুক্তরাজ্যকে ৩৮২টি এলাকায় ভাগ করে ফলাফল গণনা চলছে। প্রধান ভোট গণনা কর্মকর্তা জেনি ওয়াটসন বলেছেন, ম্যানচেস্টার টাউন হলে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

এই গণভোট গোটা যুক্তরাজ্যকে দু’ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। ইইউতে থাকার পক্ষে ভোট দিতে প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন ও লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। তাদের যুক্তি, এতে করে দেশটি আরও সমৃদ্ধ ও নিরাপদ থাকবে।

অন্যদিকে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন সাবেক লন্ডন মেয়র ও বর্তমান এমপি বরিস জনসন। এই পক্ষের মত, নিজ দেশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে আনার এটাই মোক্ষম সময়।

শুক্রবার ভোটের ফল প্রকাশের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় লন্ডনের ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে স্ত্রী সামান্থাকে পাশে রেখে এ ঘোষণা দেন ডেভিড ক্যামেরন।

তিনি বলেন, জনগণের নতুন নির্দেশনার আলোকে দেশকে এগিয়ে নিতে পরিচালকের ভূমিকা পালন করা তার জন্য সঙ্গত নয়।

এ সময় ধরা গলায় ক্যামেরন বলেন, আমি এই দেশকে ভালোবাসি এবং এ জন্য যা কিছু করণীয়, তার সব কিছুই আমি করব।

ইইউ ছাড়ার পক্ষে গণভোটে রায় আসার ব্যাপারে তিনি বলেন, ব্রিটিশ জনগণের ইচ্ছা এমন এক নির্দেশ, যা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।

ক্যামেরন জানান, আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কনজারভেটিভ পার্টির কনফারেন্সে দলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে। এ সময় পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করে যাবেন।

তিনি বলেন, আমাদের এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পুনরায় সমঝোতা করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এজন্য দৃঢ় স্বংকল্প ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নেতৃত্ব প্রয়োজন।

ইইউ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর যুক্তরাজ্যের নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন ক্যামেরন।

ক্যামেরনের ঘোষণার আগে অবশ্য ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিপ হেমন্ড বলেছিলেন, ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে গণভোটে রায় এলেও ডেভিড ক্যামেরনই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকবেন।

তিনি বলেছিলেন, ক্যামেরনই প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, তিনিই ব্রিটিশ জনগণের নির্দেশনাকে বাস্তবায়ন করবেন।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে ডেভিড ক্যামেরন ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি নির্বাচিত হতে পারলে ইইউতে থাকা প্রশ্নে গণভোট করবেন।

৪৩ বছরের বন্ধন ছিন্ন হচ্ছে যুক্তরাজ্যের

২৮ জাতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ৪৩ বছরের বন্ধন ছিন্ন হচ্ছে যুক্তরাজ্যের। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের পর ব্রিটেনই প্রথম দেশ, যারা সংস্থাটি থেকে বেরিয়ে আসতে চলেছে।

কিন্তু এখনি ইইউ থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে আসতে পারছে না। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত দুই বছর সময় অপেক্ষা করতে হবে তাদের।

গণভোটের প্রচারণায় আন্দোলনকারীরা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ২০২০ সালের আগে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে না। অন্তত পরবর্তী নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

লিসবন চুক্তির আর্টিকেল-৫০ ধারা মোতাবেক এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিবে কখন তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করবেন।

আর্টিকেল-৫০ ধারা মোতাবেক সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে ব্রিটেন দুই বছর সময় পাবে।

এ ধারা মোতাবেক কোনো দেশ একবার বেরিয়ে এলে সকল সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া পুনরায় যোগদান করতে পারবে না।

এ প্রক্রিয়া মাথায় রেখে অবশ্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন আগেই বলেছেন, ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে গণরায় এলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি আর্টিকেল-৫০ নিয়ে আলোচনায় বসবেন।

তবে ইইউ বিরোধী প্রচারাভিযানে নেতৃত্বদানকারী বরিস জনসন ও মাইকেল গোভ জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ক্যামেরনের তাড়াহুড়ো করা উচিত হবে না।

তারা এও বলেছেন, ইইউ ছেড়ে আসার আগে ইইউ বিচারকদের ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরা, শ্রমিকের অবাধ চলাচল সীমিতকরণ এবং সম্ভাব্য ইউকে চুক্তি লংঘনের দায়বদ্ধতাসহ বেশ কিছু পরিবর্তন চান তারা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রিটেনের সরকারকে তার ভবিষ্যত বাণিজ্যিক সম্পর্কও নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এছাড়া অ-ইইউ দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তিগুলোও নির্দিষ্ট করতে হবে।

ইইউ আইনের ৪০ বছরেরও অধিক বিষয় নিয়ে হোয়াইটহল এবং ওয়েস্টমিনস্টারকে এখন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করতে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন কোন নির্দেশনা ও প্রবিধান রাখা কিংবা সংশোধন বা বাতিল করা হবে।

ব্রিটিশ মুদ্রায় নাটকীয় ধস

ঐতিহাসিক গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেয়ার পরপরই নাটকীয় ভাবে পড়ে যায় পাউন্ডের দর। এক পর্য়ায়ে পাউন্ডের মান ১০ শতাংশ কমে যায়। ১৯৮৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত কখনও এতো নিচে নামেনি পাউন্ডের দাম।

ফল প্রকাশের আগে পাউন্ডের দর উল্টো বাড়ছিল। অনেক ব্যবসায়ীদের ধারণা ছিল, ইইউতে থাকার পক্ষে রায় দেবেন ব্রিটিশরা।

মুদ্রা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০০৮ সালে দেশটিতে যখন অর্থনৈতিক সংকট চলছিল, তখনও এত বাজে অবস্থা হয়নি।

ভোটের ফল গণনা শুরুর আগে পাউন্ডের দাম উঠেছিল ১ দশমিক ৫০ ডলার। যুক্তরাজ্য ইইউতে থাকবে- এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। এমনকি ইউরোর বিপরীতে পাউন্ডের দাম ৭ শতাংশ কমে ১ দশমিক ২০৮৫ ইউরোতে দাঁড়ায়। ডলারের বিপরীতে ইউরোর দামেও ধস নামে। প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায় দাম। যা ইউরো মুদ্রা চালু হওয়ার পর একদিনে সর্বোচ্চ কমার হার।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে পাউন্ডের দাম বেড়ে ১ দশমিক ৫ ডলার ছিল। কিন্তু ভোট গণনার প্রথম ফলেই যখন দেখা যায়, ইইউ ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে বেশি মানুষ। এ কারণে উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডে পাউন্ডের দাম কমে ১ দশমিক ৪৩ ডলারে দাড়ায়। যা স্থানীয় সময় বেলা তিনটার পর আরও একধাপ কমে।

ভোটের এই প্রভাব পড়েছে দেশটির শেয়ারবাজারেও। শুক্রবার লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে এফটিএসই ১০০ সূচক খোলার মুখেই ৮ শতাংশ ধস নামে। এর প্রভাব শুধু যুক্তরাজ্যেরই নয়, জাপানের শেয়ারবাজারেও পড়েছে। সেখানে নিককি ২২৫ সূচক ৮ শতাংশের বেশি কমে যায়।

ইইউ বিচ্ছেদে বাংলাদেশের প্রভাব

বাংলাদেশ বরাবরই ব্রিটেনের ইউরোপীয় জোটে থাকার পক্ষে ছিল। ইইউ থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে গেলে বাংলাদেশের রফতারি পণ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশ এতদিন ইইউ’র বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত পণ্য রফতানি করলেও এখন ব্রিটেনের বাজারে তা পারবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও খরচ বৃদ্ধি এবং সুবিধা হ্রাসের ফলে বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে উচ্চশিক্ষায় অনাগ্রহ দেখা দেবে। আশঙ্কা আছে, ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে ব্রিটেনকে অর্থনৈতিকভাবে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। যার আঘাত ব্রিটেনে থাকা বাংলাদেশিদের উপরও লাগবে।

সাহায্যকারী দেশ হিসেবে ব্রিটেন বাংলাদেশের পুরোনো বন্ধু। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কি ধরনের মনোভাব দেখাবে সেটিও স্পষ্ট নয়। যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজেটে এতদিন ব্রিটেন অবদান রাখলেও এখন এই অবদান আর রাখবে না। ফলে বাংলাদেশের ওপর সাহায্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তেই পারে।

ইইউ থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। ইইউ ছিন্ন একক ব্রিটেনে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে দু’পক্ষকেই হয়তো নতুন করে হিসেব মেলাতে হবে।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *