আসুন, টিনএজারদের প্রতি দেই সচেতন দৃষ্টি
মতামত

আসুন, টিনএজারদের প্রতি দেই সচেতন দৃষ্টি

আসুন, টিনএজারদের প্রতি দেই সচেতন দৃষ্টি

ইশরাত জাহান নিশাত

এই পৃথিবীতে মানুষ কখনো আবেগতাড়িত হয়ে ,আবার কখনও সঙ্গদোষে,কখনো জঠর জ্বালা নিবৃত্তির জন্য, আবার কখনোও অপ্রাপ্তির কারণে মনের দুঃখে অপরাধ করে।

কথায় আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আদালত হল মানুষের বিবেক। যারা নিয়মিত অপরাধ করতে থাকে তাদের বিবেক তেমন দংশন করে না কারণ অপরাধ করতে করতে তাদের বিবেক ভোতা হয়ে যায় । কিন্তু যারা কোন কারনে প্রথমবার অপরাধ করে তাদের বিবেক তাদেরকে প্রতিনিয়ত দংশন করতে থাকে। তাই অনেক অপরাধী এই দংশনের কারনে অকপটে স্বীকার করেন নিজের অপরাধের কথা।

ঐশী আমাদেরই সৃষ্টি। ঐশী তার বাবা-মাকে খুন করার পেছনে আমাদের সমাজ, পরিবার, এমনকি রাষ্ট্রও দায়ী। আমরা ঐশীর মত মেয়েদেরকে ঠিকমত পরিচালনা করতে পারিনি বলেই ঐশী খুনী হয়ে উঠেছে। ঐশীকে ফাঁসি দিলেই যে নতুন কোন ঐশীর জন্ম হবেনা এরকম কোন গ্যারেন্টি নেই । আধুনিকতার নামে আমরা আমাদের বাচ্চাদেরকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।

মা-বাবাকে হত্যাকারী ঐশী রহমান তেমনি একজন হত্যাকারী। ২০১৩ সালের ১৬ই আগষ্ট চামেলীবাগের নিজ বাসায় খুন হন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ( রাজনৈতিক) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী আগের দিন রাতে কোন এক সময় কফির সাথে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে বাবা-মাকে কুপিয়ে হত্যা করে মেয়ে ঐশী রহমান । পরদিন সকালে ৭ বছর বয়সি ছোট ভাইকে নিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে যায় । পরে ভাইকে এক প্রতিবেশীর বাসায় পাঠিয়ে একদিন পর গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে রমনা থানায় আত্মসমর্পন করেন।

অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ‘ও’ লেভেলের ছাত্রী ঐশী রহমানকে তার মা-বাবাকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ডের রায় দিয়েছে আদালত । হত্যাকান্ডের পর ঐশীকে আশ্রয় দেওয়ায় তার বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে দুই বছর সশ্রম কারাদন্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং আরেক বন্ধু আসাদুজ্জামান জনিকে বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত এই হত্যাকান্ডে তার কোন সম্পৃক্ততা না থাকায় ।

ঐশীকে ফাঁসি দিলেই দেশের সব টিনএজরা ভালো হয়ে যাবে না । ঐশীর বয়স নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক থাকলেও ঐশীর বয়স ১৭ কিংবা ১৮/১৯ যাই হোক এ বয়সের ছেলেমেয়েরা একটু আধটু ভুল করেই থাকে তা বয়স বিবেচনা করে মওকুফও করে থাকেন অনেকে। তবে সে ক্ষেত্রে ঐশীর অপরাধের মাত্রাটা অনেক বেশী ছিল।

আমাদের কথা হচ্ছে কেন আমাদের সমাজে ঐশীর মত মেয়ের জন্ম হবে । ঐশী আমাদেরই সৃষ্টি। ঐশী তার বাবা-মাকে খুন করার পেছনে আমাদের সমাজ, পরিবার, এমনকি রাষ্ট্রও দায়ী। আমরা ঐশীর মত মেয়েদেরকে ঠিকমত পরিচালনা করতে পারিনি বলেই ঐশী খুনী হয়ে উঠেছে। ঐশীকে ফাঁসি দিলেই যে নতুন কোন ঐশীর জন্ম হবেনা এরকম কোন গ্যারেন্টি নেই । আধুনিকতার নামে আমরা আমাদের বাচ্চাদেরকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। ভাল ফলাফলের পেছনে ছুটছি তো ছুটছি ।

আমাদের বাবা- মায়ের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য থাকে কিভাবে তাদের ছেলেমেয়েদের সাফল্যের শিখরে পৌছানো যায়। কিভাবে ছেলেমেয়েরা একজন ভাল মানুষ হয়ে উঠবে সেটা তাদের কাছে খুবই গৌণ একটি বিষয়।

আমার সংস্কার নয়, আমাদের বাঙ্গালী মূল্যবোধে যে সব আচার-বিচার বেমানান, এমন সকল বিষয় আমাদের আরো পাগল করে তুলেছে। আকাশ-সংস্কৃতির প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমাদের সমাজ ও পরিবারে।

আবার অনেক বিদেশী সিনেমা ও নাটকে অনৈতিক সম্পর্ক, বেপরোয়া জীবন-আচার বিভিন্ন ধরণের অপরাধ দেখানো হচ্ছে হরহামেশা। অথচ এধরণের সংস্কৃতি দেশের সামাজিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে পারিবরিক কলহ ও ব্যাপক হারে বাড়ছে।

যে কোন উন্নয়নশীল দেশের সার্বিক উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু বিপর্যয় ও ঘটে যা প্রায়ই উন্নয়নের ডামাডোলে চাপা পড়ে যায় । তেমনই একটি বিপর্যয় হল মাদকাসক্তি। ইদানীং কালে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা খুব বেশী মাদকের দিকে ঝুকে পড়েছে। এটা যেন ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে।

জাতিসংঘের জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৯ লক্ষ মাদকসেবী আছেন তারা প্রত্যেকে ঐশী হয়ে উঠতে পারে যদি আমরা মাদক সেবন এবং মাদকের ব্যবসা বন্ধ করতে না পারি। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে মাদক ব্যবসায়ীরা দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে । মাদক ব্যাবসায়ীরা একটুও কী চিন্তা করে যে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধবংস করে দিচ্ছি শুধুমাত্র কতগুলো টাকার জন্য? অন্যের ছেলেমেয়েদের ধবংস করে আপনার ছেলেমেয়েরা কখনো ভাল থাকবে না ।

ছেলেমেয়েরা বড় হওয়ার সাথে সাথে তাদের দেহে ও মনে আমুল পরিবর্তন দেখা দেয় । তখন তাদেরকে সব সময় চোখে চোখে রাখতে হয়ে । তাদের বেশী বেশী সময় দিতে হয় । তাদের অব্যক্ত কথাগুলো বুঝে নিতে হয় । উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদেরকে বেশী টাকা পয়সা দিতে নেই । অর্থই অনর্থের মুল সেটা তখন বেশী কার্যকর হয় । হাতে মোটা অংকের টাকা দিয়ে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের খারাপ হওয়ার সনদ কিনে নিলাম । আর ধর্ম যেন অপশন্যাল সাবজেক্ট। এটাকে গুরুত্ব দেওয়ায় কোন প্রয়োজনই মনে করে না অনেক অভিবাবক । পরিবার হল ছেলেমেয়েদের প্রাইমারী ট্রেনিং সেন্টার । এই ট্রেনিং সেন্টারে শিখাতে হবে ভাল কাজের সুফল কি আর মন্দকাজের তিরস্কার কী ?

মাটি নরম থাকতে আপনি ঠিক করে নিবেন তাকে কোন আকৃতি দিবেন । ছোটবেলায় শাসন না করে হটাৎ করে বড় হলে শাসন করা আরম্ভ করলে সে আর সেটা সহ্য করতে পারে না ।

পরিবারে অভিভাবকের নির্দেশনায় ছেলেমেয়েরা বড় হবে অর্থাৎ মা-বাবা পথ দেখিয়ে দিবেন সেই পথ দিয়ে তারা জীবনকে নিয়ে যাবেন তাহলে আপনার ছেলে কিংবা মেয়ে বিপদগামী হওয়ার সম্ভবনা থাকে না। টিনএজারদের মনে আবেগই প্রধান ভুমিকা পালন করে, আর বাস্তবতা ? সেটা তাদের ধারে কাছেও আসতে পারেনা । এটা বয়সের দোষ তাদের নয় ।

ঐশীর বাবা-মা তাকে ঠিকমত পরিচালনা করতে পারেনি বলেই ঐশীর হাতে তাদের মুত্যু হল । নিঃসন্দেহে ঐশী অপরাধী । আর এ সকল অপরাধের যথার্থ শাস্তিদানের বিধান না থাকলে সমাজ ব্যবস্থা অচল হয়ে যাবে । এ পৃথিবী বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে । তাই দেখা যায় পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সভ্য দেশেই অপরাধের শাস্তিদানের ব্যবস্থা চালু আছে । অপরাধীকে অপরাধের জন্য শাস্তিদান করলে সে আর অপরাধ কর্মে যাবে না। বিচারাসনে বসে বিচারক অপরাধীকে অপরাধের জন্য উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করেন এটাই বিচারকের কর্তব্য। কিন্তু ঐশীর অপরাধের সাথে আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র ও এর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী তাহলে সবার অপরাধের শাস্তি সে কেন একা বহন করবে ? আর ঐশীকে ফাঁসি দিলে এসব সমস্যার সমাধান হবে না ।

তাই ঐশীর শাস্তির মাত্রাটা একটু কমিয়ে ঐশী কেন বেপোরোয়া জীবনের দিকে গেল তার কারন অনুসন্ধান করে সেগুলো যদি সমাধানের পথ খোঁজা যায় তবে ভবিষ্যতে আর কোন ঐশীর জন্ম হবে সেটা অন্তত হলফ করে বলা যায় । আসুন আমরা সবাই টিনএজারদের প্রতি সচেতন দৃষ্টি দিই যেন ভবিষ্যতে আর কোন ঐশী না হয় সৃষ্টি ।

লেখিকা: কর্মজীবি, মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *