আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ। জাতিসংঘ ঘোষিত ২০১৫ সালে এই দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নারীর ক্ষমতায়নেই মানবজাতির ক্ষমতায়ন’।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ। জাতিসংঘ ঘোষিত ২০১৫ সালে এই দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নারীর ক্ষমতায়নেই মানবজাতির ক্ষমতায়ন’।আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ। জাতিসংঘ ঘোষিত ২০১৫ সালে এই দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নারীর ক্ষমতায়নেই মানবজাতির ক্ষমতায়ন’।

এ প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে নিয়ে সারা বিশ্বের মতো আজ বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৫। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের নারীরা আজ শুধু গার্মেন্ট শিল্পেই নন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসা, উদ্যোক্তা, সাংবাদিকতা, এভারেস্ট জয়, খেলা, সৃষ্টিশীল এমনকি যুদ্ধ বিমান চালনাতেও একে একে নিজেদের দক্ষতা, যোগ্যতা আর গ্রহণযোগতার প্রমাণ রেখে চলেছেন।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, মানবসূচক উন্নয়নে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের নারীরা অনেক এগিয়ে গেছে।

এটি জাতীয় অর্থনীতিতে এক ধরনের ইতিবাচক প্রভাব আনবে। তাছাড়া দেশের শীর্ষ কর্মপদে বাংলাদেশ নারীদের ক্ষমতায়নে অনেক দূর এগিয়েছে। এটিরও একটি শুভ প্রভাব অনিবার্য। আমর্ত্য সেনের কথার রেশ ধরে বাংলাদেশের নারীদের এমন অগ্রযাত্রার উদাহরণ বিশ্ব সমাজকে চমকে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পেছনের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। ১৮৫৭ সালের এই দিনে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে একটি সূচ কারখানার মহিলা শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। ওই সময় ১২ ঘণ্টা কর্মদিবসের বিরুদ্ধে নারীরা আন্দোলনে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ফলে তাদের ওপর নেমে আসে পুলিশি নির্যাতন। ১৮৬০ সালের একই দিনে ওই কারাখানার নারী শ্রমিকরা ‘মহিলা শ্রমিক ইউনিয়ন’ গঠন করেন। আর সাংগঠনিকভাবে আন্দোলন পরিচালনা করেন। এ আন্দোলনের ফলে ১৯০৮ সালের ৮ই মার্চ প্রায় ১৫ হাজার নারী শ্রমিক নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ভালো বেতন এবং ভোটের অধিকার দাবি নিয়ে নিউ ইয়র্ক সিটিতে মিছিল বের করেন। অতঃপর ১৯১০ সালের ৮ মার্চ কোপেনহেগেন শহরে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে জার্মানির নারী নেত্রী কারা জেটকিন এই দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯১১ সালে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। ১৯৮৫ সালে ৮ মার্চকে জাতিসংঘও আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল প্রথমবার এ দিবস পালন করা হয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে।

নারী মুক্তির অগ্রদূত ক্লারা জেটকিন

১৮৫৭ সালের ৫ জুলাই জার্মানির স্যাক্সোনি প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন ক্লারা জেটকিন। তখনকার দিনে জার্মান মেয়েদের লেখাপড়ার তেমন অবাদ সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। মানুষের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও চিন্তাভাবনার দিক থেকে গভীর বিশ্লেষণী এবং প্রচণ্ড সাহসী ক্লারা। ১৮৭৪ সালের দিকে জার্মানির নারী আন্দোলন ও শ্রম আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

তারুণ্য উদীপ্ত একুশ বছর বয়সেই ১৮৭৮ সালে সভ্য হন ‘জার্মান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি’র কিছু সময় পর তার পরিচয় হয় রাশিয়ান বিপ্লবী ওসিপ জেটকিনের সঙ্গে। দুইজন সমাজ বদলের একনিষ্ঠ কর্মী নিজেরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৮৭৮ সাল সময়টা বড় কঠিন হয়ে ওঠে জার্মান সোস্যালিস্টদের জন্য। ততদিনে ক্লারা জেটকিন এক পরিচিত সোস্যালিস্ট নেতা। শ্রমিকদের মধ্যে দিন-রাত একাকার করে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছেন। নিষিদ্ধ করে দেয়া হয় সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি। শুরু হলো দমন-পীড়ন পার্টি নেতা ও সদস্যদের ওপর। অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও ক্লারা জেটকিন সাহসীকতার সঙ্গে সে সময় পার্টির পত্রিকা প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। নানান সমস্যা ও পারিবারিক দুরবস্থার কথা কখনো তিনি তেমনটা আমলে নেননি। শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির সংগ্রামকে কীভাবে আরো অগ্রসর করা যায়, সমাজে নারীদের ন্যায্য অধিকারকে কীভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং প্রকৃত অর্থেই সব বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে একটি সমাজতান্ত্রিক সমতার সমাজ নির্মাণ করা যায় এই ছিল ক্লারার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ক্লারা জেটকিনের কথার মধ্যে অদ্ভুত এক সুরের ছন্দবদ্ধ সাবলিলতা ছিল। নিমিষেই যে কারো সঙ্গে অবলীলায় মিশে যেতে পারতেন। অল্প কথায় এবং যে কোনো গভীর বিষয়কে এক উপলব্ধিময় অনুভূতির ভাষা দেয়ার অসামান্য এক ক্ষমতার গোপন এক শৈলী জানা ছিল জেটকিনের।

তার জীবনী পড়তে গিয়ে বারবারই মনে হয়েছে এসব গুণগুলো তিনি তার মায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক সম্পর্কের ভেতর দিয়ে নিজের মধ্যে বিকশিত করে গড়ে উঠেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের একজন বিপ্লবী নেতা। বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টিশীল চর্চার মধ্য দিয়েও সমাজের ভেতর যে একটা সংস্কৃতিগত প্রগতিশীল রূপান্তর আনা যেতে পারে সে ব্যাপারেও ক্লারা জেটকিন বেশ সচেতন প্রয়াস নিয়েছিলেন।

১৮৯১ সালে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো ‘সমতা’ নামক নারীদের একটি পত্রিকা। ওই পত্রিকার মাধ্যমেই ক্লারা নারীদের সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত করার পাশাপাশি তাদের ন্যায্য অধিকারের লড়াইগুলোর নানান বিশ্লেষণ ও সমাজে তার প্রভাবে সুফলগুলো প্রচার করতে থাকেন। এই পত্রিকা সমগ্র জার্মানসহ সারা বিশ্বের নারীদের এক সমাজতান্ত্রিক সমতার পৃথিবী গড়ার স্বপ্নে একত্রিত ও অনুপ্রাণিত করতে থাকল। অধিকারের জন্য লড়াই করার প্রেরণা হয়ে উঠেছিল মুখপত্রটি।

১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কর্মজীবী নারী সম্মেলনে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক নারীদের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। তার বক্তব্যে তিনি আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের খসড়া প্রস্তাবটি পেশ করেন। প্রস্তাবে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর বিশ্বের সব দেশে একই দিনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করতে হবে।’ তিনি নিজে ৮ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে প্রথম পালন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ১৯১৫ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারীদের নিয়ে যুদ্ধবিরোধী সম্মেলন করেন।

‘নারীদের বাড়ির চার দেয়ালে আটকে রাখার অর্থ হলো তাদের জীবনকে নিছক সন্তান ধারণ ও ঘরের কাজের দাসত্বে বেঁধে রাখা। তবে এ বক্তৃতায় তিনি আর একটি কথা বলেছিলেন, যেহেতু ধনতন্ত্র নারী পুরুষকে সমানভাবে শোষণ করে চলেছে তাই নারীর জন্য আলাদাভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধা চাওয়া অপ্রয়োজনীয়’। পরে তার সে ভাবনা বদলিয়ে বলেছিলেন, ‘শ্রমজীবী নারীদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে দু’রকম শোষণ চলতে থাকে। ঘরের হাড়ভাঙা খাটুনি ও কারখানায় অক্লান্ত পরিশ্রম। আবার পুরুষের তুলনায় কম মজুরি গ্রহণ করা।’

তখনকার সময়টায় নারীদের ভোটাধিকারের ন্যায্য দাবিটিকে শ্রেণিসংগ্রাম ও সমাজতন্ত্রের মূল লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে ভাবা হতো। ক্লারা জেটকিন এ ব্যাপারে যথেষ্ট সরব ভূমিকা পালন করেন। অসম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধেও তিনি ভোটাধিকারকে একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আজ সারা পৃথিবীজুড়ে যে নারী অধিকারের কথা নারীর ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা এবং ইকুয়েল জেন্ডার থিংকিং এগিয়েছে তার পেছনে এ ক্লারা জেটকিনের সংগ্রামী জীবনের একটি বিপ্লবী ভূমিকা রয়েছে। ক্লারা জেটকিন নারীমুক্তি ও সমাজতন্ত্রকে একত্রিত এক সংগ্রাম হিসেবে দেখেই সারাজীবন লড়াই করে গেছেন। তার একনিষ্ঠতা ও সাহসী ভূমিকা এবং সংগ্রামের সঙ্গে মিলিত হলেই নারীর মুক্তিও সাম্যের পৃথিবীর যে স্বপ্ন আমরা লালন করছি তা এগিয়ে নেয়া আরো দৃঢ়তার সঙ্গে সম্ভবপর হয়ে উঠবে। ১৯৩৩ সালের ২০ জনু মস্কোতে মৃত্যুবরণ করেন। মস্কোর ক্রেমলিনে তাকে সমাহিত করা হয়।

ইতিহাসের পাতায় নারী দিবস

ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটা ৮ মার্চ। বিশ্বজুড়ে চলছে নারী দিবস। বাজারের চাপে দিবসের ভিড়ে এই দিনটা অনেকটা আলাদা। কারণ মানুষ হিসেবে একজন নারী পরিপূর্ণ অধিকারের দাবিতে সুদীর্ঘকাল যে আন্দোলন চালিয়ে আসছে, তারই সম্মানস্বরূপ পালিত হচ্ছে নারী দিবস। অন্তত একটা দিন গোটা বিশ্ব আলাদা করে মনে করে নারীরাই এই জগতের শক্তির উৎস আর প্রেরণা। যদিও, আলাদা করে বছরের একটা বিশেষ দিনে নারী দিবস পালন করা নিয়ে নানা কথা হয়। নিন্দুকরা নাক সিঁটকে বলেন, সবটাই বাড়াবাড়ি। কিন্তু যারা এ কথাটা বলেন তারা নিশ্চয় ইতিহাসের পাতাটা ভালো করে উল্টে দেখেননি। তাই বিশেষ করে তাদের জন্য আর সকলের জন্য থাকল নারী দিবসের ইতিহাস নিয়ে ছেঁড়া একটা পাতা।

সামাজিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ধারায় দেখা যায়, নারী কোনও অংশেই পুরুষের পিছনে ছিল না। ফ্রান্সের প্যারি কমিউন, ফরাসি বিপ্লব, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনসহ ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে পুরুষের পাশেই নারীকে দেখা যায়। কিন্তু, কাঙ্ক্ষিত দাবি নারী সমাজ অর্জন করতে পারেনি। কর্মক্ষেত্রে নারীর মজুরি পুরুষের চেয়ে কম। আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের ২০০৯-এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে পুরুষের চেয়ে নারী ১৬ ভাগ পারিশ্রমিক কম পায়। অপর এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে নারীরা কাজ করছে শতকরা ৬৫ ভাগ।

বিপরীতে, তার আয় মাত্র শতকরা দশ ভাগ। পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সংখ্যানুপাত প্রায় সমান। অথচ, দুনিয়ার মোট সম্পদের একশ` ভাগের মাত্র এক অংশের মালিক মেয়েরা। মেয়েদের গৃহস্থালী কাজের আর্থিক স্বীকৃতি এখনও দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, তা অর্থনৈতিক মূল্যে অদৃশ্যই থাকে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা তো বটেই এমনকী উন্নত বিশ্বের চিত্রটাও অনেকটা একই। কখনও শ্লীলতাহানি, কখনও যৌন নির্যাতন, কখনও মেয়ে হিসাবে জন্মানোর জন্য চূড়ান্ত নিপীড়ন, আবার কখনও ধর্ষণ। মহিলারা সত্যি ভাল নেই। বিশ্ব, সমাজ, যুগ যত তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে, ততোই এগিয়ে চলার চেষ্টা চালাচ্ছে মেয়েরা। কিন্তু, কিছু মানুষের লোভ-লালসা, আর কিছু অদৃশ্য শক্তি মহিলাদের কেমনভাবে যেন পিছনে টেনে ধরে রেখেছে। সেই অদৃশ্য শক্তিকে অগ্রাহ্য করে কেউ কেউ অনেক উপরে উঠতে পারলেও, বেশিরভাগই সেই অদৃশ্য শক্তির কাছে পরাজয় স্বীকার করছেন। ইতিহাসের পাতা কিন্তু বলছে মেয়েরা পারবে সেই অদৃশ্য শক্তিকে ভেঙে ফেলে অনেক অনেক এগিয়ে যেতে।

ইতিহাসের পাতায় নারী দিবসের উল্লেখ্যযোগ্য দিন
১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকরা রাস্তায় নামেন।

১৮৬০ সালের ৮ মার্চ নারী শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হয়ে তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নিজস্ব ইউনিয়ন গঠনে ব্যর্থ হয়।

১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনের নেত্রী ক্লারা জেটকিন পুরুষের পাশাপাশি নারীর সম-অধিকারের দাবিটি আরও জোরালো করেন।

১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্টে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন।

১৯০৮ সালে নিউ ইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে ১৭টি দেশের ১০০ জন প্রতিনিধি নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন।

১৯১১ সাল থেকে ৮ মার্চ দিনটিকে `নারীর সম-অধিকার দিবস` হিসেবে পালিত হয় ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে এই সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী।

১৯১১ সালের ১৯ মার্চ প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করা করা হয়। এই দিনে সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, অষ্ট্রিয়া ও জার্মানিতে লক্ষাধিক নারী মিছিল ও সমাবেশের মধ্য দিয়ে এ দিনটি উদযাপন করেন।

১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে।

১৯৪৫ সালে সানফ্রান্সিসকোতে রাষ্ট্রসংঘ স্বাক্ষর করে `জেন্ডার ইকুয়ালিটি` চুক্তিতে নারী অধিকারের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনায় রেখে।

১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে অনেকটা এগিয়ে যায়।

১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৮ মার্চ নারী দিবস পালনের জন্য উত্থাপিত বিল অনুমোদন পায়।

১৯৮৪ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করে জাতিসংঘ। ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রসংঘ এই সিদ্ধান্ত নেয়।

২০০৯-এ বিশ্বের ২৯টি দেশে সরকারি ছুটি সহ প্রায় ৬০টি দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালিত হয়েছে।

২০১০ সালে বিশ্বজুড়ে নারী দিবস পালন করা হয়। অভূতপূর্ব সাড়া মেলে।

ইতিহাসকে স্বীকৃতি
বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় ৮ মার্চ। এরমধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, কিউবা, জর্জিয়া, গিনি-বিসাউ, ইরিত্রিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, লাওস, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনেগ্রো, রাশিয়া, তাজাকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উগান্ডা, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়া।

চীন, মেসিডোনিয়া, মাদাগাস্কার, নেপালে শুধুমাত্র মেয়েরাই সরকারি ছুটি পায়।

মেয়েদের জন্য সেরা ও নিকৃষ্টতম দেশ

২০১১ সালে জাতিসংঘের সমীক্ষা অনুযায়ী সারা বিশ্বে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য সেরা ও নিকৃষ্টতম দেশ একনজরে –

সংসদীয় রাজনীতিতে মহিলাদের যোগদানের ক্ষেত্রে সেরা: রোয়ান্ডা। রোয়ান্ডার সংসদে ৮০টি আসনের মধ্যে ৪৫টি মহিলাদের দখলে। এটিই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে সংসদে মহিলারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে ওমান, কাতার, সৌদি আরব, বেলিজের সংসদে একজনও মহিলা সদস্য নেই।

শিশু কন্যা জন্মানোর সেরা স্থান গ্রিস। এ বিষয়ে নিকৃষ্টতম দক্ষিণ সুদান।

পৃথিবীতে মহিলাদের সর্বাধিক গড় আয়ু জাপানে, ৮৭ বছর। মহিলাদের গড় আয়ু সর্বনিম্ন লেসোথোতে, মাত্র ৪৫ বছর।

আমেরিকা পৃথিবীতে সর্বাধিক মহিলা অ্যাথলিট তৈরি করে। আরবের দেশগুলি এবিষয়ে সব থেকে নীচে অবস্থান করছে। সেখানে মেয়েদের এখনও খেলাধুলোয় অংশগ্রহণের অধিকার নেই।

জামাইকাতে উচ্চ আয়ের ৬০% চাকরি মেয়েদের দখলে। সেখানে ইয়েমেনে উচ্চ আয়ের মাত্র ২% চাকরি মেয়েরা করেন।

লেসোথোতে নারী শিক্ষার হার পৃথিবীতে সর্বাধিক। সেদেশে ৯৫% মহিলারাই স্বাক্ষর। ইথিওপিয়াতে প্রতি ১০০ জনে মাত্র ১৮ জন শিক্ষার আলো দেখতে পায়।

রাজনীতিতে যোগদান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সহ বিভিন্ন বিষয়ে সামগ্রিকভাবে আইসল্যান্ড মহিলাদের পক্ষে বসবাসের সেরা স্থান দখল করে।

পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র আমাদের দেশে প্রতি ১০০০ জন পুরুষ প্রতি নারীর সংখ্যা বর্তমানে ৯৪০। মাত্র ৬৫% মহিলারা স্বাক্ষর। মনে রাখতে হবে স্বাক্ষর আর শিক্ষিত (অন্তত ক্লাস এইট পাস) এই শব্দ দুটির মধ্যে পার্থক্যটা কিন্তু কয়েক যোজনের। একশ পাঁচ বছর বয়সের নারী দিবসের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে ভারতের সামগ্রিক ভাবে মেয়েদের অবস্থার দিকে একবার চেয়ে দেখলে শিউড়ে উঠতে হয়। গণধর্ষণের প্রতিবাদে যে দেশ উত্তাল হয়, সেই দেশেই সোনি সোরির যৌনাঙ্গে নুড়ি গোঁজে পুলিস। আফস্পার লাগাতার ধর্ষণের শিকার হন কাশ্মীর, মণিপুরের মহিলারা। ১৯৮৪ সালের শিখ হত্যা হোক বা গুজরাট দাঙ্গা, সবকিছুই মেয়েদের উপর শারীরিক নিগ্রহের বিষয়ে কোথাও যেন একবিন্দুতে মিশে যায়। সলওয়া জুরুমের নামে আদিবাসী মেয়েদের উপর চলে যৌন নির্যাতন। শ্বশুর ইমরানাকে ধর্ষণ করলে সমাজপতিরা সেই ধর্ষককেই ইমরানার স্বামী বলে ঘোষণা করে। হেতাল পারেখ, অনিতা দেওয়ান, জেসিকা লাল, প্রিয়দর্শিনী মাট্টু, নয়না সাহানি বা গুয়াহাটির সেই মেয়েটির মত গুটিকয়েক নাম হয়ত সংবাদমাধ্যমের সৌজন্য লাভ করে। কিন্তু বাকিরা?

ভারতে পণপ্রথায় ঠিক কত জন মেয়ে বলি হয়েছে তার হিসাব কি কারও কাছে আছে? ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মেয়ে হওয়ার অপরাধে জন্মের পরেই নুনের পুঁটলি মুখে ঠেসে খুন করা হয় অগুনতি শিশুকে। কারও কারও তো আবার পৃথিবীর মুক্ত বাতাসের স্বাদ নেওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগটুকুও হয় না। ভ্রূণেই শেষ করে দেওয়া হয় তাদের। বাড়িতে ছোট ভাইয়ের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে কত শত মেয়েকে যে নিজের ন্যূনতম শিক্ষার অধিকার বিসর্জন দিতে হয় তারই বা হিসাব রাখে কে। নাবালিকা বিয়ে তো আকছার ঘটে। বউ পেটানোতো এদেশের ট্র্যাডিশন। লিঙ্গ বৈষম্যের থাবা অপুষ্টিকেও ছাড়ে না। না খেতে পেয়ে অপুষ্টিতে এদেশে পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি মেয়েরা প্রাণ হারায়। আসলে এদেশের অধিকাংশ মেয়েরাই জানে না প্রতিনিয়ত কী বিপুল নিগ্রহের শিকার হতে হয় তাদের। `ঐতিহ্য`, `পরম্পরার` মত ভারী শব্দের নীচে জোর করে চেপে রাখার চেষ্টা চলে এদেশের মেয়েদের কণ্ঠস্বর। কখনও আত্মত্যাগের মত মহান শব্দের আড়ালে মুড়ে রাখার চেষ্টা হয় নিগ্রহকে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এদেশের মেয়েদের জন্মের পর থেকেই যা হচ্ছে, যেটা হচ্ছে সেটাই নিয়ম, সেটাই স্বাভাবিক বলে শেখানো হয়।

তাদের ভাবতে শেখানো হয় পুরুষরা উন্নততর। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেড়ে ওঠা এদেশের বেশির ভাগ মহিলাদের নিজেদের সামগ্রিক অধিকার সম্পর্কে কোনো ধারণাই তৈরি হয় না।

নাৎসি আক্রমণ হোক বা `৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। দুই দেশ, দুটি জাতি, দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে যেকোনো রকম হানাহানির শেষটুকু হয়েছে মেয়েদের উপর শারীরিক নিগ্রহের মধ্য দিয়েই। এখনও গৃহযুদ্ধে অশান্ত মধ্য আফ্রিকার দেশগুলোতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের খাতিরে ধর্ষণ করা হয় মেয়েদের।

মহিলাদের ভোটাধিকার নেই আরবের বিভিন্ন দেশে। সমশ্রমে সমবেতনের অধিকার নেই দক্ষিণ কোরিয়ার মত দেশের মেয়েদের। সমকামি হওয়ার অপরাধে খুন হতে হয় দক্ষিণ আফ্রিকার বহু মেয়েকে। ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত কোটি কোটি মহিলা। থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডের রাস্তায় বাজারি বস্তুর মত ভোগ্য সামগ্রী হিসাবে বিক্রি হয় নারী শরীর। এমনকী, উন্নত ও উন্নয়নশীল পশ্চিমি দেশগুলোতেও সামগ্রিক ভাবে মেয়েদের অবস্থানটা মোটেও অসাধারণ কিছু নয়।

এত সব কিছুর মাঝেই আজ নারী দিবস। অর্ধেক আকাশের অধিকারের দাবিতে আরও একবার শপথ গ্রহণের দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *