indian-adani-power-plant-in-Bangladesh

বিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়াতে আদানির সঙ্গে চুক্তি

আন্তর্জাতিক জ্বালানী বিষয়ক গবেষনা সংস্থা ‘ইন্সটিটিউট অব এনার্জী ইকোনমিক্স এন্ড ফাইনান্সিয়াল আনালাইসিস’ (আইআইইএফএ) আদানি গোড্ডা পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্টঃ খুব খরুচে, খুব দেরী, খুব ঝুঁকিপূর্ণ’’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। একই সংস্থা রামপাল পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করে জুন ২০১৬-তে!
প্রতিবেদনটির শুরু হয়েছে এই বলে যে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তবে আদানির সাথে চুক্তি কিছুতেই তার ভালো উপায় নয়। এটি খুব খরুচে এবং কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য একেবারেই অযৌক্তিক।
২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার দীর্ঘ ২৫ বছর মেয়াদী এই চুক্তিটি সই হয়। এর আগে ২০১৬ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ আদানির বিদ্যুৎ কেনার সার্বিক দিক যাচাইয়ের জন্য ৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটি সেই প্রতিবেদনে দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের চেয়ে আদানি গ্রুপ থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের দাম বেশী হবে দেখায়। তবে একই সাথে এই কমিটি ২৫ বছর মেয়াদী চুক্তির জন্য সরকারকে সবুজ সংকেতও দেয়!
পরিবেশগত দিক থেকে এটি বাংলাদেশের জন্য রামপাল পাওয়ার প্রজেক্টের চেয়ে কম ক্ষতিকারক হলেও এর ইউনিট প্রতি খরচ খরুচে রামপালের চেয়েও ০.৯৩ টাকা বেশী। যেখানে আদানি ভারতে বিদ্যুৎ সরবারহ করছে ৪.৮০ কিলোওয়াট ঘন্টায় এবং যেখানে ভারতে সরকারিভাবে(NTPC)কয়লা দ্বারা উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৩.২১টাকা।
দাম বেশী যে কারনে
রামপালে যেখানে ভারত থেকে আমদানীকৃত ভারতীয় কয়লা ব্যবহৃত হবে সেখানে আদানি পাওয়ার প্ল্যান্টে ব্যবহৃত হবে সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানীকৃত কয়লা! অথচ ঝাড়খন্ডে প্রস্তাবিত আদানি গোড্ডা পাওয়ার প্ল্যান্টের মাত্র ১৬ কিমি দূরেই জিতপুরে কোম্পানিটির নিজস্ব কয়লা খনি আছে। ২০১৫ সালের তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনায় স্থানীয় ঝাড়খন্ডবাসীদের বিদ্যুৎ সরবারহের জন্য স্থানীয় কয়লা দিয়েই বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট তৈরীর কথা ছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে চুক্তির পর কয়লার সংস্থানও বদলে যায়। এখন চুক্তি অনুযায়ী জিতপুরের এত কাছের কয়লা খনি রেখে তারা অস্ট্রেলিয়া থেকে তাদের নিজস্ব কারমিখায়েল কয়লা খনি (Carmichael Coal Mine) থেকে কয়লা আমদানী করবে যার সম্পূর্ন খরচও যোগাতে হবে বাংলাদেশকে!
কোম্পানিটি অষ্ট্রেলিয়ায় একটি (Carmichael Coal Mine) কয়লা খনি কিনে ভারতে অবস্থিত তাদের পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো বিশেষ করে মুন্দ্রা পাওয়ার প্ল্যান্টে(Mundra Power Plant) কয়লা সরবারহের জন্য। নিজেদের কয়লা খনি রেখে বিদেশী খনি কেনার কারন হল ভারতের কয়লা অত্যন্ত নিম্নমানের। এই কয়লা ব্যবহার করে কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানের ভারতের পরিবেশ ছাড়পত্র পাওয়া কঠিন যেমন ভারতের কোন রাজ্যে ছড়পত্র না পেয়ে এনটিপিসিকে বাংলাদেশের সুন্দরবনের রামপালে তাদের প্রজেক্ট শুরু করতে হয়!
কিন্তু আদানি নিজেদের খনি থেকে কয়লা কেনা নিয়েও দারুন ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়!
ভারতের শুল্ক বিভাগের ২০১৬ সালের দাখিলকৃত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী আদানি ২০১৫-১৬ সালে আদানি বিদেশে তাদের নিজস্ব কয়লা খনি থেকে কয়লা ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ দাম বেশী দেখিয়ে ভারতীয় টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত!
বাংলাদেশ আদানির বিদ্যুৎ ২৪৫ কি.মি দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে আমদানী করবে যার সম্পূর্ন টাকা ২৫ বছর ধরে বাড়তি বিদ্যুৎ মূল্যের সাথে পরিশোধ যোগ্য! ২৫ বছর পর হয় এটা হয় ভারতের মালিকানাধীন হয়ে যাবে,অথবা বাংলাদেশকে চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে নয়তো পরিত্যাক্ত ঘোষনা করতে হবে।
আদানি কি আদৌ কোন সক্ষম প্রতিষ্ঠান
বর্তমানে আদানি পাওয়ার লিঃর দুই (মুন্দ্রা কয়লা ভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্ট ও কারমিখায়েল কয়লা খনি)প্রকল্পই ভীষন লোকসানি!সর্বশেষ আর্থিক বিবরনী (৩১শে ডিসেম্বর ২০১৭) অনুযায়ী আদানি পাওয়ার লিমিটেডের নিট ক্ষতি ২৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মোট ঋণের পরিমান ৭.২ বিলিয়ন ইউএস ডলার যা কোম্পানিটির সম্পদের চেয়ে ১৬ গুন বেশী! আইফার প্রতিবেদকদ্বয়ের মতে স্বয়ং আদানির আর্থিক নিরীক্ষকরাই যেখানে কোম্পানির ভবিষ্যৎ টিকে থাকা নিয়ে শংকিত, সেখানে শঙ্কা থেকেই যায় যে এই বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট কখনো নির্মিত হবেই না বা হলেও বাংলাদেশকে ব্যপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।আদানির এই উদাহারনও আছে,তাদের মুন্দ্রা পাওয়ার প্ল্যান্ট ইতমধ্যে গুজরাটে বিদ্যুৎ সরবারহ বন্ধ করে দিয়েছে,যা গুজরাট রাজ্যের সাথে তাদের সম্পাদিত চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন!
অব্যাহত লোকসান ও টাকা পাচারের চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারির পর শেয়ার বাজারে আদানির ব্যপক দরপতন হয়,যদিও বাংলাদেশের সাথে চুক্তির পর শেয়ারের দর এখন মোটামুটি চাঙ্গা।কয়লার দাম বেশী দেখিয়ে টাকা পাচারের সাথে ভারতীয় রিলায়েন্স কোম্পানীর নামও উঠে আসে যাদের সাথে বাংলাদেশের আরও দুইটি বিদ্যুৎ চুক্তি রয়েছে,একটি কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় ও আরেকটি মেঘনাঘাটে!
চুক্তি অনুযায়ী আমদানি ২০২০ সালের বিদ্যুৎ রফতানি করবে কথা থাকলেও কাজ শুরু করতে দেরী করায় ২ বছর পিছিয়ে সব কিছু ঠিক থাকলেও এখন সেটি ২০২২ সালের আগে কিছুতেই সম্ভব নয়,এছাড়াও ১৭৫ জমি অধিগ্রহনের পূর্ন টাকাও তারা জানুয়ারী ২০১৮ পর্যন্ত পরিশোধ করতে পারেনি!
কোম্পানিটি তাই বাংলাদেশের সাথে চুক্তির মাধ্যমে এই লোকসান কাটিয়ে উঠতে মরিয়া!আইফার প্রতিবেদন অনুযায়ী এটা স্পষ্ট যে,আদানি তাদের সম্পুর্ন নিজস্ব সুবিধা অনুযায়ী প্রকল্পটি সাজিয়েছে যেখানে বাংলাদেশ শুধুমাত্রই স্বার্থহীন এক ক্রেতার ভুমিকা পালন করছে!

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *