আগস্টে বিএনপির কাউন্সিল, মহাসচিব হচ্ছেন ফখরুল

আগামি ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেই আগস্টে ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড।

আগামি ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেই আগস্টে ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। আগামি ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেই আগস্টে ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। ওই কাউন্সিলেই দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারমুক্ত হতে যাচ্ছেন। স্থায়ী কমিটি থেকেও বাদ পড়ছেন বেশ কিছু সদস্য। কাউন্সিলের আগেই একযোগে ভেঙে দেয়া হবে ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা কমিটি। একই সঙ্গে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর শীর্ষ পদেও রদবদলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে কালো তালিকাভুক্তির কাজ শুরু হয়েছে। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে কৌশলে এসব কাজ হচ্ছে। দল গোছানোর পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের রদবদলের চিন্তাভাবনাও চলছে।

সূত্র জানায়, মামলা নেই, দলীয় কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় নয়, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে ‘নিরাপদ’ থাকছেন- এমন নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে কালো তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী, এমপি এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের মধ্যে যারা সক্রিয় ছিলেন এবং মামলা-হামলা ও নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের বাদ দিয়ে বাকিদের এই কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। বিগত আন্দোলনে কার কি ভূমিকা ছিল তা জানাতে তৃণমূলে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তৃণমূল থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বোঝা যাবে বিগত দিনে কারা সক্রিয় ছিলেন আর কে বা কারা ফাঁকি দিয়েছেন।

নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবার বিগত দিনের আমলনামাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। ইতিমধ্যেই কিছু ক্ষেত্রে এর নমুনা দেখা যাচ্ছে। যারা দলের পক্ষে কাজ করেছেন তাদের মূল্যায়নও শুরু করেছে হাইকমান্ড। মঙ্গলবার দলের সহ-দফতর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি আবদুস সালাম আজাদকে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। প্রয়াত নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ওই পদে ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি তাইফুল ইসলাম টিপুকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-দফতর সম্পাদক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। গঠনতন্ত্রের প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাদের এ দায়িত্ব দিয়েছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। রদবদল করা হয়েছে যুক্তরাজ্য বিএনপি শাখা কমিটিও। আবদুল মালেককে সভাপতি এবং এমএ কয়সার আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। শায়েস্তা চৌধুরী কুদ্দুসকে করা হয়েছে কমিটির প্রধান উপদেষ্টা।

পঞ্চম কাউন্সিলের পর দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পান প্রয়াত নেতা খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ তিনি মারা যান। এরপর দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তাকে ভারমুক্ত করা হয়নি। বিগত আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি কারাগারে আছেন। বর্তমানে শারীরিক অবস্থাও ততটা ভালো নয়। এমন পরিস্থিতিতে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করার ব্যাপারে ইতিবাচক দলের হাইকমান্ড। আসন্ন কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারমুক্ত করার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে দলের একটি সূত্র জানায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির ১৯ সদস্যের মধ্যে বেশ কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। কয়েকজন নিষ্ক্রিয়। দলের কোনো কার্যক্রমে তারা অংশ নিচ্ছেন না। এম শামসুল ইসলাম, ড. আরএ গনি, বেগম সরোয়ারী রহমান দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। শাসমুল ইসলাম গত দুই বছর ধরে স্থায়ী কমিটির বৈঠকগুলোতে অনুপস্থিত থাকছেন। এছাড়া বর্তমানে কারাগারে আছেন মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। এই চারজনসহ আরও দু-একজনকে স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ দেয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা চলছে। স্থায়ী কমিটি থেকে সরিয়ে তাদের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা করা হতে পারে।

১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে নতুন মুখ হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকার সাবেক মেয়র ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, আবদুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু। এছাড়াও ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামও আলোচনায় রয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ায় সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব পদটি দীর্ঘদিন খালি রয়েছে। ওই পদের জন্য অনেক আগে থেকেই লবিং করে যাচ্ছেন যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, আমান উল্লাহ আমান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু। বিএনপির একটি সূত্র জানায়, মির্জা ফখরুলকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হলে সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবির রিজভী আহমেদের নাম মোটামুটি নিশ্চিত। এছাড়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম-মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল করা হবে। ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের নির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চিন্তাভাবনা চলছে।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর দল পুনর্গঠন করে বিএনপি। ২০০৯ সালের জুন মাসে একসঙ্গে ৭২টি সাংগঠনিক জেলা কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। ওই বছর ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল। পরের বছর জানুয়ারিতে গঠন করা হয় ৩৮৬ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় নির্বাহী কমিটি। তিন বছর মেয়াদি কমিটির সময় আড়াই বছর আগেই শেষ হয়েছে। এর আগে দুই দফা কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিলেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।

কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি প্রায় সব সাংগঠনিক জেলা এমনকি অঙ্গসংগঠনের বেশির ভাগ কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দীর্ঘদিন মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোয় দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। কমিটি না হওয়ায় কেউ ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছেন না। অভিযোগ আছে গত জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে অনেক অযোগ্য নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয়েছে। স্বজনপ্রীতি এমনকি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ওইসব পদ দেয়া হয়েছে বলেও গুঞ্জন ছিল। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতে, সুযোগ সন্ধানী এবং ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলে নেয়ায় তারা বিগত আন্দোলনে গা ঢাকা দেন।

সূত্র জানায়, গত আন্দোলন চলাকালে গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকাবস্থায় খালেদা জিয়া নিজে বহু নেতার সঙ্গে টেলিফোনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও অনেককে পাননি। এছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারাও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। তাদের সম্পর্কেও খোঁজ নেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে তৃণমূল নেতাদের কাছ থেকে খালেদা জিয়া জানতে পেরেছেন মামলা না থাকলেও নানা অজুহাতে দলের সাবেক মন্ত্রী-এমপিসহ গুরুত্বপূর্ণ বহু নেতা আত্মগোপনে আছেন। তারা কোনো নেতাকর্মীর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন না। এসব নেতার কারও কারও বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে ‘নিরাপদ’ থাকার অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে দলের চেয়ারপারসন অবিহত হয়েছেন, যাদের নামে কোনো মামলা নেই তারা দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে যেমন থাকেন না; তেমনি কোনো নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগও রাখেন না। বরং কোনো নেতাকর্মী দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়ার জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বারণ করেন- এমন প্রমাণও পেয়েছেন চেয়ারপারসন।

ইতিমধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর থেকে দলের জেলা, থানা, পৌর ও ইউনিয়ন শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে আন্দোলনে অংশ নেয়া ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের সার্বিক চিত্র জানাতে বলা হয়েছে। যাদের নামে মামলা আছে তাদের তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে শুধু মামলার সংখ্যা উল্লেখ নয়, এজাহারও পাঠাতে বলা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের তালিকা ইতিমধ্যে দফতরে আসা শুরু হয়েছে। কৌশলে এলাকাভিত্তিক কালো তালিকাও তৈরি হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত তালিকা বাদ দিয়ে যাদের নাম পাওয়া যাবে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *