অনন্ত জলিলকে শুধুই প্রযোজক হিসেবে চাই
বিনোদন

অনন্ত জলিলকে শুধুই প্রযোজক হিসেবে চাই

কবিও কাব্যফজলে এলাহী পাপ্পু

৯০ দশকে বাংলা মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের যখন রমরমা অবস্থা চলছিল , যখন আমরা রুবেল, মান্না, সালমান, সানী’র একের পর এক নতুন চলচ্চিত্রে মগ্ন ঠিক তখনই ১৯৯৫ সালে হেলাল খান নামের এক বড় বাজেটের প্রযোজক ও নায়ক এর আবির্ভাব ঘটলো। যিনি তাঁর প্রযোজিত ছবিতে অভিনয় করতেন । তাঁর প্রথম ছবি গুণী পরিচালক হাফিজউদ্দিন পরিচালিত ‘প্রিয় তুমি’ ছবিটি ছিল বক্সঅফিসে দারুন হিট ছবি । ছবির মুল নায়ক নায়িকা ছিলেন ওমর সানী ও মৌসুমি । ২য় নায়ক প্রযোজক হেলাল খান ও নায়িকা নবাগতা সন্ধ্যা। সানী মৌসুমির ক্রেজে, আর আলাউদ্দিন আলীর সুর করা দারুন কিছু গানের উপর ভর করে হেলাল খান পুরোই সফল হয়েছিলেন । ‘প্রিয় তুমি’ ছবিতে মাসুদ করিমের লিখা ও আলাউদ্দিন আলীর সুর করা ‘তুমি এমন কোন কথা বলো না ‘, ‘দুঃখ দেয়ার মানুষটাও হারিয়ে গেছে আমার ‘ ও ‘একদিন যদি না তোমায় দেখি / মনে হয় কতদিন দেখিনি’ গানগুলো আজ যদি নতুন কোন শ্রোতা শুনেন তাহলে প্রথমে আধুনিক গানের কোন অ্যালবামের গান মনে করে ভুল করতে পারেন । হেলাল খান প্রথম ছবিতে টাকা ব্যয় করতে কোন কার্পণ্য করেননি। সেই থেকে প্রযোজক হেলাল খানের নামের সাথে নায়ক / অভিনেতা হেলাল খান যুক্ত হয় । উনার ২য় ছবি ‘সাগরিকা’ তেও উনি খুব গুরুত্ব পূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তরুন জনপ্রিয় নির্মাতা বাদল খন্দকার পরিচালিত ‘সাগরিকা’ ছবির মুল চরিত্র তিনটি তা হলো নায়ক আমিন খান , নায়িকা ঋতুপর্ণা ও হেলাল খান নিজেই । ছবিটি ছিল অতুল অগ্নিহোত্রী, নানা পাটেকর ও মাধুরী অভিনীত বোম্বের একটি ছবির নকল । সেই ছবিতে নানা পাটেকরের চরিত্রটি হেলাল খান অভিনয় করেছিলেন । এভাবেই প্রযোজক হেলাল খান অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রমান করতে লাগলেন বা নিজের নামের পাশে চিত্রনায়ক/ অভিনেতা শব্দগুলো ব্যবহার করেছিলেন । দর্শকও চিনেছে ,জেনেছে হেলাল খান নামের এক প্রযোজক ও অভিনেতা ছিলেন । যিনি এখন চলচ্চিত্র নির্মাণ ও অভিনয় কোনটাতেই নেই । আজ এতদিন পর প্রযোজক হেলাল খান এর কথাগুলো কেন মনে হলো জানেন? কারনটা তাহলে বলছি-

একজন সত্যিকারের চলচ্চিত্রপ্রেমি হিসেবে অনন্ত প্রযোজক হিসেবে এই মূলধারার চলচ্চিত্রের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাবেন এটা কি আমরা চাইতে পারি না? এটা কি আমরা ভাবতে পারিনা? আমরা প্রযোজক অনন্ত জলিলকে চাই যিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিবেন । নিজের ভালো কাজগুলোকে হাসি তামাশায় পরিণত করে কেন শুধু শুধু ব্যর্থ করে দিবেন? আমরা চাইনা কদিন পর অনন্ত জলিল হেলাল খান, রানা হামিদ, মাসুদ শেখদের মতো হারিয়ে যান। আমরা প্রযোজক অনন্ত জলিলের পাশে আছি ,পাশে থাকবো কথা দিলাম ।         

অনন্ত জলিলকে শুধুই প্রযোজক হিসেবে চাইঅনন্ত জলিল এই নামটি গত ৩/৪ বছর ধরে আমাদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের এক আলোচিত, সমালোচিত নাম হয়ে আছে । যিনি একজন শিল্পপতি , প্রযোজক ও নায়ক হিসেবে আজ পরিচিত। আজ উনার শিল্পপতি উপাধিটা আড়াল হয়ে গেছে প্রয়োজক ও নায়ক দুটি উপাধির কারনে। বাংলা চলচ্চিত্রের আজ সেই ৯০ দশকের রমরমা যুগ নেই । নেই এ কে এম জাহাঙ্গীর খান, আজিজুর রহমান বুলি, শেখ মুজিবর রহমান, শাহ আলম খান , সফর আলী ভূঁইয়া এর মতো প্রভাবশালী, বিত্তশালী প্রযোজকেরা। ঠিক এই মুহূর্তে অনন্ত জলিল এর মতো একজন শিল্পপতির চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবে আগমন যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো । আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রযোজক অনন্ত জলিলকে শ্রদ্ধা করি , তাঁর চেষ্টাটুকুকে সাধুবাদ জানাই । আমাদের চলচ্চিত্রে অনন্ত জলিলের মতো আন্তরিক মানুষের আজ খুব বেশি প্রয়োজন । কিন্তু সমস্যাটা পাকিয়েছে ‘চিত্রনায়ক অনন্ত জলিল’ । অনন্ত জলিল নিজের প্রযোজিত ছবিতে নিজেই নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন বারবার আর দর্শকরা নায়ক অনন্ত জলিলকে নিয়ে হাসি তামাশা করছে যা দেখে একজন চলচ্চিত্রপ্রেমি হিসেবে খুব কষ্ট লাগে । এই হাসি তামাশার কারনে অনন্ত জলিলের এতো সুন্দর প্রচেষ্টা সব ঢাকা পরে যাচ্ছে । ফেইসবুক, ব্লগ, পত্রিকা, টিভি চ্যানেল সব জায়গায় অনন্ত যা করে সেটা হয়ে যায় হাসি তামাশার বিজ্ঞাপন । কিন্তু কেন? কারন দর্শক প্রযোজক অনন্ত জলিল কে চায় কিন্তু চিত্রনায়ক অনন্ত জলিলকে নয় । আর চিত্রনায়ক যদি হওয়ার ইচ্ছেও থাকে তাহলে ধীরে ধীরে অভিনয়ের কলাকৌশল শিখে এগুলে ভালো হয় । নিজের টাকা দিয়ে ছবি বানাবেন বলে এক লাফেই ছবির মূলনায়ক হয়ে পর্দায় হাজির হবেন আর দর্শক তা মেনে নিবে এমন দর্শক আজ বাংলা চলচ্চিত্রে নেই ।অনন্ত জলিল যতগুলো ছবি বানিয়েছে তার সবগুলোতে যদি মূল নায়ক হিসেবে অন্য কাউকে প্রমোট করতেন তাহলে ছবিগুলো কি দারুন বিনোদনধর্মী ছবি না হতো সেটা কি জলিল সাহেব একবারও ভেবে দেখেছেন? বাংলা চলচ্চিত্রে প্রয়াত জসিমও খলনায়ক থেকে নায়ক হয়ে দর্শকদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য ঠাই করে নিয়েছিলেন । কিন্তু সেটা অনন্ত জলিলের সাহেবের মতো করে নয় । জসিম তাঁর প্রযোজিত ছবিগুলোতে খলনায়ক হিসেবে দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন । খলনায়ক হিসেবেই জসিম শুরু করেন ও প্রশংশিত হয়েছিলেন । কিন্তু একদিন সুভাশ দত্ত তাঁর ‘সবুজ সাথী’ ছবিতে ২য় নায়ক হিসেবে জসিমকে পর্দায় হাজির করেন । আলমগিরের পাশে জসিম খারাপ অভিনয় করেনি । জসিমের নায়কোচিত চেহারা, স্বাস্থ্য না থাকতে পারে কিন্তু অভিনয় দক্ষতা দারুন ছিল । এইভাবে ২য় নায়ক থেকে ধীরে ধীরে জসিম একক নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন । একদিনে এক ছবি দিয়েই জসিম নিজেকে খলনায়ক থেকে নায়কে পরিণত করেননি । দর্শক জসিমের অভিনয় দক্ষতার প্রশংশা করতো ।

ananta_jalil_portraitআজ চলচ্চিত্রের সেই রমরমা সময়টা নেই বলে যদি কেউ মনে করেন দর্শকদের যা দিবো তাই খাবে সেটা ভুল। অনন্ত জলিলের মতো নিজের ছবিতে নায়ক হয়েছেন আর পরবর্তীতে হারিয়ে গেছেন এমন আরও উদাহরন আছে । সেই ৯০ দশকে রানা হামিদ নামে এক প্রযোজক নিজের প্রযোজিত ‘গ্যাংলিডার’ ছবিতে একক নায়ক হয়ে হাজির হয়েছিলেন । সেই ছবিতে যদি রানা হামিদ নিজে নায়ক না হয়ে রুবেল, মান্না , সানী বা জসিম কে রাখতেন তাহলে ছবিটা দারুনভাবে দর্শকরা গ্রহন করতো । জমজমাট গল্প ও বিনোদন থাকা সত্ত্বেও ছবিটা ধরা খেলো বক্স অফিসে । এই অভিজ্ঞতার বদলে পরের ছবিতেই রানা হামিদ ২য় নায়ক হয়ে জসিম কে নিয়ে তৈরি করলেন ‘রাজাগুন্ডা’ ছবিটি যা সফল হয়েছিল । ৯০ দশকের আরও একটি উদাহরন হলো মাসুদ শেখ । যার বাবা শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন দারুন সফল এক প্রযোজক । বাংলা চলচ্চিত্রে ‘হাসনাবাদ কথাচিত্র ‘ সফল একটি প্রতিষ্ঠান । সেই প্রভাবশালী প্রযোজকের ছেলে মাসুদ শেখ নিজেদের প্রযোজিত ‘দেশপ্রেমিক’ ছবিতে খুব ছোট্ট একটি চরিত্র দিয়ে পর্দায় হাজির হয়েছিলেন । ‘দেশপ্রেমিক’ ছবিটি জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছিল যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন আলমগীর। এরপর মাসুদ শেখ আবারো নিজেদের প্রযোজিত ‘ আসামী বধূ’ ছবিতে ২য় নায়ক হিসেবে শাবনুরের সাথে অভিনয় করেন । ছবিটি ব্যবসাসফল হয় কারন ছবির মূল কাহিনী আলমগীর ,ববিতা ও হুমায়ুন ফরিদি কেন্দ্রিক। মাসুদ শেখ শুধু ২য় নায়ক হিসেবে যতটুকু প্রাধান্য পাবার কথা ততটুকুই। এই ছবির সফলতার পর মাসুদ শেখ আবারো ২য় নায়ক হয়ে হাজির হয়েছিলেন ‘খবর আছে’ নামের ছবিতে। যে ছবির মূল নায়ক / নায়িকা ছিলেন মান্না ও মৌসুমি। মান্নার উপর ভর করে মাসুদ শেখ এবারও দারুন সফল । এরপর মাসুদ শেখ একক নায়ক হিসেবে পর্দায় আসেন নিজেদের প্রযোজিত ও কাজী হায়াত পরিচালিত ‘ পাগলা বাবুল’ ছবির মাধ্যমে । ছবিটি কাজীর রাজনৈতিক বক্তব্য প্রধান ছবি যা মাসুদ শেখ না থাকলে যথারীতি দারুন সফল একটি ছবি হতো । সেই ‘পাগলা বাবুল’ দিয়ে মাসুদ শেখ বুঝলেন আসলে চিত্রনায়ক হওয়া তাঁর কাজ নয়, তাঁর কাজ প্রযোজক হিসেবেই দারুন । তবুও মাসুদ শেখ এর নামের পাশে চিত্রনায়ক/অভিনেতা শব্দটি তিনি আজ ব্যবহার করতেই পারেন কারন তিনি তো সত্যি সত্যি চিত্রনায়ক / অভিনেতা ছিলেন । সফল হোন আর নাই হোন ছিলেন তো?

শিল্পপতি অনন্ত জলিলের নামের পাশে আজ চিত্রনায়ক/ অভিনেতা শব্দগুলো ব্যবহার করতেই পারেন কারন তিনি একাধিক ছবিতে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন এটা তো সত্য । দর্শক গ্রহন করুক আর নাই করুক । এই নামে বাকী জীবন পার করে দেয়া যাবে । এবার না হয় একজন সত্যিকারের চলচ্চিত্রপ্রেমি হিসেবে অনন্ত প্রযোজক হিসেবে এই মূলধারার চলচ্চিত্রের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাবেন এটা কি আমরা চাইতে পারি না? এটা কি আমরা ভাবতে পারিনা? আমরা প্রযোজক অনন্ত জলিলকে চাই যিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিবেন । নিজের ভালো কাজগুলোকে হাসি তামাশায় পরিণত করে কেন শুধু শুধু ব্যর্থ করে দিবেন? আমরা চাইনা কদিন পর অনন্ত জলিল হেলাল খান, রানা হামিদ, মাসুদ শেখদের মতো হারিয়ে যান। আমরা প্রযোজক অনন্ত জলিলের পাশে আছি ,পাশে থাকবো কথা দিলাম ।

 

ফজলে এলাহী পাপ্পুব্লগার, বাংলা চলচ্চিত্র ও দেশীয় গান সংগ্রাহক। ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত রেডিও বিজি ২৪ নামক দেশের সবচেয়ে বড় গানের সংগ্রহশালার কর্ণধার। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *